জনতার কাঠগড়ায় মেয়র বড়লেখা পৌরসভা নির্বাচনী ইশতেহারের বেশির ভাগই অপূর্ণ

জানুয়ারী ১১, ২০১৮, ১০:৫৭ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ৪০ বার পঠিত

আব্দুর রব॥ বড়লেখা পৌরসভার পরিকল্পিত উন্নয়ন, পৌরকর যৌক্তিক ও সহনীয় পর্যায়ে রাখা, কাউন্সিলারগনের মাধ্যমে পৌরসভার বিদ্যমান উন্নয়নকাজ ও সেবা বিকেন্দ্রীকরণসহ ৩১টি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে ২০১৫ সালের পৌর নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হয়ে মেয়র নির্বাচিত হন সাবেক জেলা যুবলীগের সহসভাপতি আবুল ইমাম মোঃ কামরান চৌধুরী। মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। তবে তার দেয়া প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই এখনও অপূর্ণ। শহরের যানজট নিরসনের লক্ষে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ, জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ, শহরের এ গ্রেড রাস্তাসমুহের সংস্কার কাজ সম্পন্ন,বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে শহরে ওয়াটার সাপ্লাই, ড্রেনেজ ও স্যানিটেশন প্রকল্পে পৌরসভাকে অর্ন্তভুক্তকরণ মেয়র কামরানের সাহসী ও যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। তবে ফুটপাতের ভাসমান ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ ও বিভিন্ন মার্কেটের সম্মুখের পাকা স্থাপনা ভেঙ্গে প্রায় ২ মাস ধরে ছত্রভঙ্গ করে রাখায় জনদুর্ভোগ ও ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দাভাবের জন্য পৌরবাসী ও ব্যবসায়ীরা তাকেই দায়ী করছেন। শহরের প্রধান সড়কের পাশের অবৈধ স্থাপনা অপসারনে মেয়র কামরান সাফল্য দেখাতে পারলেও এর ভঙ্গুর দশা, খানাখন্দ ও ধোলা বালু থেকে পৌরবাসীকে আজও মুক্তি দিতে পারেননি।

জানা গেছে, ২০০১ সালের ১৪ জুন সাড়ে ৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে বড়লেখা পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম নির্বাচিত মেয়র আব্দুল মালিকের মৃত্যূর পর ২০১১ সালে দ্বিতীয় নির্বাচিত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক ফখরুল ইসলাম। বর্তমানে এ পৌরসভার আয়তন ২৭.৫০ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার। ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার। ২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর এ পৌরসভাটি ‘খ’ গ্রেডে উন্নীত হয়। গ্রেডের উন্নয়ন হলেও নাগরিক সেবার কোন উন্নয়ন হয়নি; বরং দুর্ভোগ বাড়তেই থাকে। সর্বমোট ৬৫ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ৩৩ কিলোমিটার রাস্তা তখনও কাঁচা। ২২ কিলোমিটার ড্রেনেজের মাত্র ২ কিলোমিটার পাকা। ঠিকাদার আর কাউন্সিলরদের টেন্ডারবাজি, কর্তৃপক্ষের দুর্বল তদারকি, স্বজনপ্রীতি, কমিশন বাণিজ্যে রাস্তা-ঘাট ও ড্রেনেজ নির্মাণে চরম অনিয়মের কারণে পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন যখন অনেকটা স্থবির। ঠিক তখন ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারী অনেকটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে পৌর পিতার দায়িত্ব নেন তরুণ রাজনীতিবিদ আবুল ইমাম মোঃ কামরান চৌধুরী। শহর ও বস্তি এলাকার জলাবদ্ধতা, যানজট ও রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থাকে বড় সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে অগ্রসর হন। তবে পৌরসভার প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকান্ডের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাই নেন বলে কাউন্সিলাররা তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। অনেকে বলেন তিনি যেসব এ গ্রেড রাস্তা সংস্কারের কাজ নিজে করার কৃতিত্ব দেখাচ্ছেন, সেগুলো সাবেক পৌর মেয়র প্রভাষক ফখরুল ইসলাম টেন্ডার আহবান করে গেছেন। যা তিনি বাস্তবায়ন করেছেন মাত্র।

পৌরমেয়র আবুল ইমাম মোঃ কামরান চৌধুরী পৌরশহরের ৮নং ওয়ার্ডের মহুবন্দ এলাকার মৃত জহির উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং আছিয়া খানম চৌধুরী আফিয়ার ৭ম সন্তান। ব্যক্তিগত জীবনে ৫ কন্যার জনক, একজন সফল ব্যবসায়ী ও শিক্ষানুরাগী। তিনি ১৯৯৮ সাল থেকে বড়লেখার খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্টান আর.কে লাইসিয়াম স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য। কলেজ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালিন সাংস্কৃতিক সম্পাদক, ১৯৯৩ থেকে ২০০০ পর্যন্ত উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন ছাড়াও আ’লীগ-ছাত্রলীগের প্রতিটি সংকটময় মুহুর্তে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। জেলা যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি, উপজেলা আ’লীগের যুব ও ক্রিড়া বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে উপজেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদে রয়েছেন। ১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ বর্তমান জাতীয় সংসদের হুইপ (তৎকালিন ইউপি চেয়ারম্যান) শাহাব উদ্দিন এমপির সাথে তিনিও দুস্কৃতিকারীর হামলার শিকার হন এবং দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হন।    

মেয়র কামরান জানান, তার নির্বাচনী ইশতেহারের ৩১টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে ১ নম্বর প্রতিশ্রুতি পৌর প্রশাসনের সকল ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতিমুক্ত রাখা। দায়িত্বগ্রহণের পর থেকেই শতভাগ এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে চলেছেন। সব ধরনের সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, আমি জনগণের কাঠগড়ায়ই থাকতেই পছন্দ করি। ভোটের রাজনীতির চেয়ে তিনি পৌরবাসীর উন্নয়ন-সুবিধাকেই বেশি প্রধান্য দিচ্ছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। বিশেষ করে দুই বছরে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির বকেয়া বিদ্যুৎ বিল ১৮ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকায় কমিয়ে এনেছেন। পৌরসভায় ৮টি টিকাকেন্দ্র থেকে ১৬টিতে উন্নীত করে শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছেন। শতভাগ পৌরবাসীকে বিদ্যুতায়িত করার উদ্যোগ নেন। ইতিমধ্যে ৪০০ পরিবারে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে। শহরের জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ উত্তরে ষাটমাছড়া ও দক্ষিণে নিকড়ি চিহ্নিত করে খননের উদ্যোগী হন। প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিএডিসি নিকড়ি ছড়ার খনন কাজ করছে। এতে শহরের দক্ষিনাঞ্চলের অকাল বন্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে তিনি আশা করছেন। ষাটমা ছড়ার খনন কাজ করার জন্য বিভিন্ন দপ্তরের সাথে চেষ্টা-তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।  

অনেকগুলি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে না পারার ব্যাপারে মেয়র কামরান বলেন, প্রধান সমস্যাগুলো ইতিমধ্যে সমাধান করেছেন এবং কিছু প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নতুন কোন রাস্তা পাকাকরণ না করলেও জরাজীর্ণ রাস্তাঘাটের ৪০ ভাগ সংস্কারকাজ সম্পন্ন করেছেন। আগামী মার্চ মাসের মধ্যে ৬০ ভাগ সংস্কার কাজ সম্পন্নের প্রস্তুতি চলছে। সকলের সহযোগিতা নিয়ে মেয়াদের মধ্যেই তিনি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অবশিষ্ট কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে দৃঢ় আশাবাদি। পৌরসভার স্থায়ী ভবন নির্মাণ ও পৌরকর সহনীয় পর্যায়ে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেক্ষেত্রে মেয়র ব্যর্থ পৌরবাসীর এমন অভিযোগের ব্যাপারে বলেন, পৌরভবন নির্মাণের লক্ষে ভুমি ক্রয়সহ অন্যান্য কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর বিভিন্ন ট্যাক্স কিছুটা বৃদ্ধি করেছেন ঠিকই কিন্তু পৌরসভার নীতিমালা অনুযায়ী এখনও সব ক্ষেত্রেই পৌরকর অনেক কম। আগে কর আদায়ের নীতিমালাই ছিল না। তিনি একটা নীতিমালার আওতায় পৌরকর আদায় করছেন এবং তা পৌর নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের সহনীয় পর্যায়ে বলে মনে করেন। উদাহরণ টেনে মেয়র জানান, পৌর নীতিমালা অনুযায়ী যে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান থেকে পৌর কর্তৃপক্ষ ট্রেড লাইসেন্স ফি ১২ হাজার টাকা নেয়ার নির্দেশনা সেখানে তিনি মাত্র ৫ হাজার টাকা নিচ্ছেন। ১৫ বছরের অবৈধ স্থাপনা অপসারণে ১/১১ এর সরকারও যা করতে পারেনি তিনি তাতে সফল হয়েছেন। মার্কেট মালিক, ব্যবসায়ী, ফুটপাত দখলদার, ইউএনও, থানার ওসি ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় পৌরশহরের প্রধান সড়কের ফুটপাত দখলমুক্ত করেছেন। ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের পৌর সুপার মার্কেটে পুনর্বাসন করেছেন। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দাভাব দেখা দেয়ার ব্যাপারে মেয়র বলেন, সাময়িক অসুবিধা হলেও স্থায়ী সুবিধার কথা বিবেচনা করলে পৌরবাসী ও ব্যবসায়ীরা অবশ্যই তার কাজের মূল্যায়ন স্বরূপ আগামীতে পুনরায় মেয়র নির্বাচিত করবেন।   

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”