টিলা খেকোদের কাছে পরিবেশ আইন শুধুই ‘নীতিবাক্য’ বড়লেখায় টিলা কাটা চলছেই অর্থদন্ড দিয়েও টিলা কাটা বন্ধ হয়নি

ডিসেম্বর ২, ২০১৭, ৩:১১ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ৮৪ বার পঠিত

আবদুর রব॥ বড়লেখায় প্রাকৃতিক টিলা কাটা অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশ আইন অমান্য করে প্রভাবশালী দুর্বৃত্তরা অবাধে টিলা কাটা চালিয়ে গেলেও তা রোধে প্রশাসন কার্যকর কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে সচেতন মহলের অভিযোগ রয়েছে। অব্যাহত টিলা কাটার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বিনষ্ট হচ্ছে এলাকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য, বিলুপ্ত হচ্ছে গাছপালা, পশুপাখি  এবং বদলে যাচ্ছে এলাকার ভু-মানচিত্র। অনেক এলাকার মানচিত্রের টিলা ও বন চিহ্নিত অংশের ভুমির সাথে বাস্তবের কোন মিল খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। এতে দেখা দিচ্ছে নানা জটিলতা।

তবে টিলা কাটার বিষয়ে বিভিন্ন সময় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে টনক নড়ে প্রশাসনের। এরপর শুরু হয় অভিযান। করা হয় দু’একজনকে জরিমানা। অভিযানও চলে কিছুদিন। তারপর অদৃশ্য কারণে থেমে যায় প্রশাসনের পরিবেশ ও আইন রক্ষার এ অভিযান। আর এ সুযোগেই টিলা কাটা চালিয়ে যায় টিলা খেকোরা। প্রকৃতি ধংস করে এরা কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে। এসব অপকর্মের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতা, প্রভাবশালী ঠিকাদার, পরিবহন মালিক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রয়েছে জনপ্রতিনিধি ও মুক্তিযোদ্ধার নামও।

অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ৬ (খ) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি বা আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করতে পারবে না। তবে অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে পাহাড় বা টিলা কাটা যেতে পারে। তবে এ আইন যেন টিলা খেকোদের কাছে শুধুই ‘নীতিবাক্য’।

 এদিকে টিলা কেটে ও পাদদেশে নির্মাণ করা ঘরের বাসিন্দারাও রয়েছেন ঝুঁকিতে। বর্ষা এলেই এসব এলাকার বাসিন্দাদের আতঙ্ক বেড়ে যায়। চলতি বছরের জুন মাসে উপজেলা সদর ইউনিয়নের ডিমাই এলাকার বিওসি কেছরিগুল (বতাউরা) গ্রামে ভারি বর্ষণে টিলার মাটি ধসে মা মেয়েসহ গত ৫ বছরে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া পাহাড়-টিলা ধসে শিশু সন্তানসহ অসংখ্য ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বড়লেখা উপজেলার পাহাড়ি এলাকা সদর ইউনিয়নের ডিমাই, কেছরিগুল, গঙ্গারজল, জফরপুর, দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের কাশেমনগর, হাকাইতি, গজভাগ, পূর্ব হাতলিয়া, দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউপির বোবারথল, মোহাম্মদনগর, ছোটলেখা, ঘোলসা, চন্ডিনগর, মুড়াউল, অফিসবাজার, উত্তর শাহবাজপুর ইউপির আতুয়া, বড়াইল, নান্দুয়া, কুমারশাইল, পূর্ব বানীকোনা, শ্রীধরপুর, দক্ষিণভাগ উত্তর (কাঁঠালতলী) ইউনিয়নের বিওসি কেছরিগুল, মাধবকু-, খলাগাওসহ বিভিন্ন গ্রামে প্রকাশ্যে টিলা কাটা হচ্ছে। এসব টিলার মাটি বহনে ব্যবহৃত হচ্ছে অন্তত ২ শাতাধিক বৈধ কাগজপত্রহীন ট্রাক ও ট্রাক্টর। ট্রাক্টরের সাহায্যে মাটি বহন করায় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ও উপজেলা শহরের প্রধান সড়ক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। অথচ অবাধে এসব ট্রাক্টর উপজেলা শহরের চলাচল করলেও তা যেন দেখেও দেখছে না প্রশাসন। নিজ বাহাদুরপুর ও দাসেরবাজার ইউনিয়নের বিভিন্ন টিলা কেটে প্রভাবশালীরা সদর রাস্তার পাশের কৃষি জমি ভরাট করছে। অবৈধ মাটি ভরাটের কারণে রাস্তার পাশের সামাজিক বনায়নের গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। নির্বিচারে প্রকাশ্যে পরিবেশ আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে। বসত বাড়ি সংলগ্ন টিলা কেটে মাটি পাচার করায় বসতিগুলো ঝুকিপুর্ণ হয়ে উঠছে। বর্ষায় অতিবর্ষণে ভুমি ধসে ঘটে হতাহতের ঘটনা। এসময় প্রশাসন টিলার পাদদেশে বসবাস নিষিদ্ধ, টিলা কাটা যাবে না ইত্যাদি জনসচেতনামুলক কিছু প্রচারণা চালিয়েই নিজেদের দায়-দায়িত্ব শেষ করে। 

সরেজমিনে উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে টিলাকাটার দৃশ্য চোখে পড়ে। এই ইউনিয়নের নান্দুয়া গ্রামের বাসিন্দা বশির আলী ও বশারত আলী, করমপুরে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার, বড়াইলে শিহাব উদ্দিন, জামাল আহমদ ও আতুয়ায় বাবুল মিয়ার বসত বাড়ির উচু টিলা থেকে মাটি কেটে নিতে দেখা গেছে। আতুয়া এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাবুল মিয়ার টিলা থেকে মাটি কাটাচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ী ও নির্মাণ ঠিকাদার। 

তবে মাটি কেটে নেয়ার বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা মিথ্যা কথা। অনেকে তার নামে যড়যন্ত্র করছে।’

 অন্যদিকে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে করমপুর এলাকায় টিলা কাটার দায়ে (টিলার মালিক) মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার ও ট্রাক্টর চালক দিনার হোসেনকে অর্থদন্ড প্রদান করে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু অর্থদন্ডের পরও টিলা কাটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

 এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সুহেল মাহমুদ জানান, ‘টিলা কাটা আইন বিরোধী কাজ। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। টিলা কাটা বন্ধে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবো। এ ব্যাপারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। টিলা কাটা বন্ধে ইতিমধ্যে তিনি অভিযান শুরু করেছেন। এর সাথে যে কেউ জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনের প্রয়োগ করা হবে।’

 

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন