পাখি আর পর্যটকে : সরগরম হাকালুকি আর বাইক্কা বিল

জানুয়ারী ৯, ২০১৯, ৬:৩৯ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ১৭১ বার পঠিত

ইমাদ উদ দীন, বাইক্কা বিল ও হাকালুকি হাওর থেকে ফিরে॥ শুষ্ক মৌসুম তাই বদলেছে দৃশ্যপট। বর্ষার সেই চেনা দৃশ্যে নেই এখন। থৈ থৈই পানির স্থান এখন ধূ ধূ মরুভূমি। শুকিয়ে যাওয়া পানির স্থান দখল করেছে সবুজ দূর্বাঘাস। আর হাওর ছেড়ে বিলগুলোতে জমেছে পানি ও মাছ। ঘাসকে কেন্দ্র করে হাওর জুড়ে ঘড়ে উঠেছে অস্থায়ী গরু মহিষের বাতান। আর বিলের মাছ খেতে জোট বেঁধেছে দেশী ও অতিথি পাখির দল। হাওরের মধ্যখানে ও পাদদেশে থাকা বিশাল সবুজ অরণ্যে আপন নিবাস এসকল পাখিদের। সবুজ ঘাস,গরু,মহিষ ও নানা প্রজাতির পাখি আর মাছের এমন মনমুগ্ধকর দৃশ্য মন নাচে আনন্দ আবেগে। এখন পাখি আর পর্যটকের ভীড়ে সরগরম হাকালুকি আর বাইক্কা বিল। স্ব গুণেই খ্যাতি আর পরিচিতি হাওর হাকালুকি।
আর হাইল হাওরের বাইক্কা বিলের। এ দুটি স্থানেই মনখোলা নৈসর্গিক সবুজ প্রকৃতির হাতছানি। নানা প্রজাতির উদ্ভিদ,জলজ আর উভয়চর প্রাণীর আবাসস্থলের জন্য যেমন হাকালুকি। তেমনি দেশীয় নানা জাতের মাছ ও পাখির অভয়ারণ্যের জন্য বাইক্কা বিল। দু’টিরই অবস্থান একই জেলার দুই সীমান্তে। শীত আর গ্রীষ্ম দু’মৌসুমে এই দুটি স্থানের প্রকৃতির দু’ধরনের রুপ সৌন্দর্য। প্রকৃতির এমন উজাড় করা রুপ মাধূর্য আকৃষ্ট করে যে কাউকে। সারা বছরই পর্যটকদের মুগ্ধ করতে প্রস্তুত হাওর হাকালুকি আর বাইক্কা বিল। বর্ষায় দু’চোখ জুড়ে থৈই থৈই পানি। বিশাল জলরাশির মধ্যখানে আকন্ঠ নিমজ্জিত হয়ে জেগে ওঠা সবুজ পত্র পল্লবের হিজল,করচ,কলুম আরো কতকি নয়ন কাড়া সবুজ জলজ বনের রাজ্য। আর শীত মৌসুমে দু’ চোখ জুড়ে শুধু সবুজ ঘাসের মাঠ। তখন পুরো হাওর জুড়ে গরু মহিষের বাতান। আর হাওরের বিলে খাদ্যের সন্ধানে অবাধ বিচরণ নানা জাতের দেশী ও অতিথি পাখির। তাই ওই সময়ে সকাল সন্ধ্যায় পাখি দেখতে স্থান দু’টিতে সমাগম ঘটে পাখি প্রেমীদের। তাই প্রকৃতির টানে ওই স্থানগুলোতে ছুটে আসেন সৌর্ন্দয পিপাসুরা। সরজমিন হাওর হাকালুকি আর বাইক্কা বিলে গেলে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে।
হাকালুকি হাওর:- স্থানীয়ভাবে প্রবাদ আছে হাওর মানে হাকালুকি আর সব কুয়া (কুপ),ব্যাটা (পুরুষ) মানে মান মনসুর আর সব পুয়া (ছেলে)। প্রকৃতির এই বিশাল দুনিয়ায় নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ,পাখি,শাপলা-শালুক,ঝিনুক, শত প্রজাতির জলজ প্রাণী আর হিজল,কড়চ,বরুন, আড়ং,মূর্তা, কলুমসহ সবুজের ঢেউ জাগানিয়া মনকাড়া পরিবেশ।
এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকির সীমানা মৌলভীবাজার জেলা ছাড়িয়ে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত। ৫টি উপজেলা (কুলাউড়া,জুড়ী,বড়লেখা,ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ) জুড়ে ২৩৮টি বিল নিয়ে এ হাওরের আয়তন ২০ হাজার ৪ শত হেক্টর। নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে থাকা হাকালুকি এখন কোনরকম তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
এবারো অতিথি পাখিরা আসছে উত্তর গোর্লাধের শীত প্রধান দেশ থেকে। একটু উম, উষ্ণতা আর খাবারের নিশ্চয়তায়। পুরো শীত মৌসুম এরা দাপিয়ে বেড়ায় হাকালুকি হাওরের এ বিল থেকে ও বিলে। আর বসন্তের শুরুতেই তাদের অস্থায়ী নিবাস গুটিয়ে নিজ নিজ দেশের আপন নীড়ের উদ্দেশ্যে উড়াল দেবে। প্রত্যুষে কিংবা গোধুলি লগ্নে পাখিদের ওড়াওড়ি, ডুবসাতার, জলখেলি, খুনসুটি, রোদে পালক পোহানু আর খাবার নিয়ে ঝগড়া কিংবা খাবার সংগ্রহের মনোহর দৃশ্য এখন হাকালুকি হাওরে। হাকালুকি হাওর পাড়ের বাসিন্দারা জানালেন হাওরের পিংলা,চাতলা,চৌকিয়া,হাওর খাল,মালাম,গৌড়কুড়ী,নাগুয়া,তুরল,কালাপানি,ফোয়ালা,বালিজুড়ী,কাংলি ও ফুটবিলে এখন অতিথি পাখির হাকডাক।
বাইক্কা বিল:- অতিথি আর দেশীয় পাখির কলকাকলিতে মুখরিত বাইক্কা বিল। ৪২৫ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিলের সুনাম প্রকৃতি প্রেমীদের মুখে মুখে। নানা জাতের গাছ,মাছ আর পাখি। বিলের পাড়ে সবুজ ঘন বন। ওখানেই স্থায়ী নিবাস ঘড়া পাখি আর পোকা মাকড়ের ডাক নিস্তব্দতা ভেঙ্গে ভিন্ন আমেজ। প্রকৃতি যেন একে অপরের সাথে মিতালি গড়েছে। এমন দৃশ্য খোলা চোখে আপন করে দেখতে কাদামাটির কষ্ঠকর পথ মাড়িয়ে ওখানে ছুটে আসেন পর্যটকরা।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী বাইক্কা বিলে প্রায় ৮০ প্রজাতির মাছ ও শতাধিক প্রজাতির পাখির অভয়াশ্রম। বাইক্কা বিল মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরের প্রায় ১শ হেক্টর আয়তনের একটি জলাভূমি। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় এই বিল মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত বিপুল অতিথি পাখি আর দেশীয় নানা জাতের ছোট বড় মাছ ও পাখির নিরাপদ আবাসস্থল এটি।
বিলের পাড় ও কূল ঘেষে হিজল,করচ,নল খাগরা,ঢোল কলমী আর ফুল ও লতাগুল্ম। বিলে কুচুরি পানা, শাপলা ও পদ্ম,সিংড়া,ওকল,মাখনা। সারা বছর জুড়ে ওখানে পাখি ও মাছের মিলন মেলা থাকলেও শীতকালে তা পায় ভিন্ন আমেজ। বাইক্কা বিলে পর্যটকদের মূল আকর্ষণ নানা জাতের পাখি। এদের মধ্যে-পানকৌড়ি,কানিবক, ডাহুক, জল মোরগ, ধলাবক, ধুপনি বক,রাঙ্গা বক, মাছরাঙা, গোবক,শঙ্খচিল, ভুবন চিল,পালাসী কুড়া ঈগল,গুটি ঈগল অন্যতম। কালো লেজ জৌরালি ও দাগিলেজ জৌরালি,লম্বা পায়ের পাখি দলপিপি,নেউপিপি,কুট,পান মুরগি ও বেগুনি কালেম,কালামাথা কাস্তেচরা, গেওয়ালা বাটান, মেটেমাথা টিটি,কালাপাখ ঠেঙ্গী,এ বিলের নিয়মিত অতিথি পাখি পান ভোলানি।
বিপন্ন তালিকায় থাকা পালাশী কুড়া ঈগল, অন্যান্য পাখির মধ্যে, দাগি রাজহাঁস,খয়রা চখাচখি, ল্যাঞ্জাহাঁস, পাকড়া কোকিল, নীললেজ সুইচোর,পাতি আবাবিল, দাগি ঘাসপাখি, সরালি, মরচেরং ভুঁতি হাঁস, গিরিয়া হাঁস,পাতিচ্যাগা উল্লেখযোগ্য। আর মাছের মধ্যে আইড়,মেনি, কাখলে, কই, ফলি, মলা, টেংরা, পুটি,দাড়কিনা,কাশখয়রা,পাবদা,মাগুর,শিং,টাকি,চিতল,কাতলা,বোয়াল,রুই,গজারসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। পাখি ও মাছের নিরাপদ আবাস্থলের কারণে এখন পর্যটকদের কাছে ক্রমেই আর্কষণীয় হয়ে উঠছে বাইক্কা বিল। এমনটি জানালেন ওয়াচ টাওয়ারের তদারকির দ্বায়িত্বে থাকা আহসান হাবীব ও রাজু আহমদ। তারা জানালেন শুক্র ও শনিবার এই দুদিন পর্যটক ওখানে বেশি আসেন। সরজমিন গতকাল বিকেলে বাইক্কা বিলে গেল দেখা মিলে প্রকৃতি প্রেমীদের।
কথা হয় সিলেটের বালাগঞ্জ থেকে আসা ডা: সাদাত হোসেন, আব্দুস ছালাম ও তাতিয়া বিশ্বাস স্মৃতি। সাইকেলিং গ্রুপের রফিকুল ইসলাম ও বিকাশ রঞ্জন দে। মৌলভীবাজার সারকারী মহিলা কলেজের শিক্ষক রবিউল আউয়াল ও জাকিয়া সুলতানা। পূবালী ব্যাংক হবিগঞ্জ শাখার ম্যানেজার মনিরুল ইসলাম তার স্ত্রী গ্রীনহীল স্কুলের শিক্ষিকা সায়েলা সুলতানা ও স্কুল পড়–য়া ছেলে তাহসিন মুনির এর সাথে। তারা সকলেই পাখি দেখে উৎফুল্ল। পাখি দেখতে ঢাকা থেকে এসেছেন সালমা বেগম নাজু, পাপিয়া পাল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসমিয়া আদিবাসহ অনেকেই। জানালে এক সাথে এতো পাখি আর চমৎকার প্রকৃতি দেখে তারা মুগ্ধ। বাইক্কা বিলের ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকা সমাজ ভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংগঠন বড়গাঙ্গিনার সেক্রেটারী মিন্নত আলী জানালেন এই প্রাকৃতিক সুন্দর্য ধরে রাখতে আমাদের প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সকলের সহযোগীতা ও সচেতনতার প্রয়োজন। তারা হাওরে মাছ বৃদ্ধির জন্য বেশি করে গভীর অভয়াশ্রম ও পাখির নিরাপদ নিবাসের জন্য বনায়নের গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”