“পীরে কামেল হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা শেরে সওয়ার চাবুকমার বোগদাদী (রঃ) এর ৬৭৯তম বার্ষীক ওরশ শরীফঃ অর্ধ সপ্তাহের মহামিলন মেলা ॥ ”

জানুয়ারী ১০, ২০১৯, ৮:২০ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ৪৩৯ বার পঠিত

মুজিবুর রহমান মুজিব॥ ইয়েমেনী বীর, পিরানে পীর হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনী (রঃ) এর স্মৃতিধন্য পূর্ণ ভূমি সিলেট তিনশত ষাট আউলিয়ার মুল্লুক হিসাবে খ্যাত। শতাব্দীর খ্যাতিমান সংসার ত্যাগী পীর শাহ জালাল সফর সঙ্গীগণ সহ সঙ্গেঁ আনা মাটি নিয়ে আল্লাহর নামে বেরিয়ে পড়েন। মাঠ-ঘাট প্রান্তর পেরিয়ে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত উপক্ষো করে আউলিয়া বাহিনাী ছুটছেন গৌড় রাজ্যের দিকে।

প্রাচীন ইতিহাস মতে সে কালে সমগ্র বৃহত্তর সিলেট লাউড়, গৌড়, জৈন্তা, তরফ এবং ইটা এই পাঁচটি প্রধান সামন্ত রাজ্যে বিভক্ত ছিল। গৌড় এর উপজাতিয় রাজা গোবিন্দ একজন অত্যাচারি ও ঝুলুমবাজ শাসক ছিলেন। ইসলাম ধর্মাবলম্বী শেখ বোরহান উদ্দীন ধর্মীয় সংখ্যা লঘু হিসাবে সামন্ত রাজা গোবিন্দের নির্যাতনের বিচার চেয়েছিলেন দিল্লীর সুলতানী দরবারে। দিল্লির মহান সুলতান অত্যাচারি সামন্ত শাসক গৌড়রাজ গবিন্দকে উচিত শিক্ষা দেবার জন্য একদল সৈন্য প্রেরন করেন। মহান আল্লাহর অপার মেহের বানী রহমত বরকত এবং আউলিয়া বাহিনীর বীরত্বে গৌড় গোবিন্দের পতন হয়, উঠে ইসলামের বিজয় নিশান। শাহ্ জালালের সঙ্গেঁ আনা মাটির সঙ্গেঁ সিলেটের মাটির মিল খুঁজে পান হযরত চাষনী পীর। আল্লাহর ইচ্ছাও ইশারায় এখানেই হুজরা স্থাপন করেন পীর শাহ জালাল বীর শাহ জালাল। সামন্ত রাজা গোবিন্দের গৌড় এর নামকরন হয় সিলহট, থেকে সিলেট। এই পীরানে পীরের নামে সিলহেটকে জালালাবাদ ও বলা হয়।

পীর শাহ জালাল সিলহটে হুজরা স্থাপন করে মহান আল্লাহর এবাদত বন্দেগীতে মশগুল হয়ে গেলেন। তাঁর সফর সঙ্গীঁগণ বেড়িয়ে পড়েন ইসলাম প্রচারে। হযরত শাহ্ জালালের প্রধান সিপাহ শালার তরফ বিজয়ে এগিয়ে যান। হযরত সৈয়দ শাহ্ মোস্তফা তৎকালীন সামন্ত শাসক চন্দ্র নারায়ন এর রাজ্যাধীন বর্তমান মোস্তফাপুর এলাকার পাহাড় অঞ্চলে হুজরা স্থাপন করতঃ এবাদত বন্দেগীও ইসলাম ধর্ম প্রচারে আত্ব নিয়োগ করেন। সাধারন জীবন যাপন, বিনয়াচরনে বিমুগ্ধ হয়ে সাধারন মানুষ দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ

করতে থাকেন। এই ওলি আল্লাহর জন প্রিয়তা ও সাধারন জীবন যাপনে বর্সিজুড়া পাহাড় এলাকায় বসবাসকারী সামস্ত শাসক চন্দ্র নারায়ন সিং নাখোশ, নারাজ হয়ে আপত্তিকর ও নেতিবাচক মন্তব্য করেন। ইতিমধ্যে একদিন রাজা চন্দ্র নারায়ন দেখতে পান তাঁর রাজসিংহাসনে এক বিশাল বিষধর সাপ বসে আছে। লোকজন মারফত সাপ বিতাড়নে ব্যর্থ হয়ে রাজা-রাজগনকের স্মরনাপন্ন হলেন। রাজ গনক গননা করে দেখলেন নবাগত পীর সাহেবের নাখোশ ও নারাজির কারনে এই অভিসাপ। রাজগনক গননা করে দেখলেন নবাগত পীর সাহেব ছাড়া রাজা চন্দ্র নারায়ন মতান্তরে রাজ্য চন্দ্র সিংহকে এ বিপদ থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবেন না। যেই কথা, সেই কাজ, গনকের রায় চন্দ্র রাজ এর ইচ্ছা মোতাবেক একদল রাজ প্রতিনিধি পীর শাহ্ মোস্তফার কাছে এসে মাফ চেয়ে বিপদ থেকে সাহায্য চান। পীরে কামেল হযরত সৈয়দ শাহ্ মোস্তফা বিস্মিল্লাহ বলে আল্লাহর নাম নিয়ে বর্সিজুড়া রাজ বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। সেকালে এলাকাটি ছিল জংগলাকির্ন, বন্য প্রানীর আবাসস্থল। যাবার পথে শাহ মোস্তফা একটি বাঘ পেয়ে তাঁর সওয়ার হন। বাঘে চড়ে রাজ বাড়ি গিয়ে রাজসিংহাসনে বসা বিষধর সর্ম্পকে ধরে চাবুকের মত ব্যবহার করে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন। রাজ বাড়ি সর্প ও শংকা মুক্ত হল। সেই সময় থেকে সৈয়দ শাহ্ মোস্তফাকে শেরে সওয়ার চাবুক মার বোগদাদী বলা হয়। সৈয়দ শাহ্ মোস্তফার কারামতি দৃষ্টে রাজাচন্দ্র নারায়ন তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতঃ তাঁর সুবিধা মত স্থানে অবস্থান ও হুজরা স্থাপনের অনুমতি দিলেন। কোন কিংবদন্তী মতে সামন্ত রাজা তাঁর বিবাহ যোগ্য কন্যাকে পীরে কামেলের সঙ্গেঁ শাদী দেন। এই রাজ কন্যা ধর্মস্তিরিত হয়ে হামিরা বিবি নাম ধারন করেন।

তিনশত ষাট আউলিয়ার মুল্লকু এই জালালাবাদ। শাহ্ জালালের সফর সঙ্গীঁ হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা এয়োদ শতাব্দীর সেই প্রায়ান্ধকার যুগে আল্লাহও রাসুল প্রেমে ফানাফল্লাহ হয়ে ইসলাম প্রচারে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। দরগা মহল্লা এলাকায় এই পীরে কামেল চীর শয়ানে শায়ীত। এই ওলি আল্লাহর দুইজন ভ্রাতাস্পুত্র হযরত সৈয়দ শাহ ইসমাইল ও শাহ্ ইয়াসিনের জোড়া মাজার দরগা মসজিদের পশ্চিম-দক্ষিন-কোনায় অবস্থিত।

অষ্টাদশ শতাব্দীর তৎকালীন মুন্সেফ ও মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ নিজ জমিদারি গবিন্দ শ্রী এলাকায় জনসাধারনের সুবিধার জন্য একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন। মৌলভী সাহেব প্রতিষ্ঠিত বাাজারটি কালক্রমে মৌলভীবাজার হিসাবে পরিচিত লাভ করে।

অতঃপর হযরত সৈয়দ শাহ্ মোস্তফার অধঃস্থন বংশধর সৈয়দ আব্দুল জলিল সিলেট শহরস্থ কাজি ইলিয়াসে এস বসাত স্থাপন করেন। তাারই সু-পুত্র সৈয়দ আবদুল মজিদ সি.আই.ই অসামের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। এই বংশের সৈয়দ খলিলুল্লাহ সালিক জুনেদ দরগা শরীফের বর্তমান মোতাওয়াল্লী। তিনি অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতার মাঝেও সততা, বিস্থতা ও আন্তরিকতার সাথে মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব পালন করছেন।

দক্ষিন সিলেটের প্রাচীন জনপদ মৌলভীবাজারকে বলা হয় শাহ্ মোস্তফার মৌলভীবাজার। জেলা ও বিভাগ বাসির অন্তরে অনুভবে চিন্তা চেতনায় আল্লাহ রসুলের পরই আছেন তিনি। তাঁর অধঃস্থন বংশধরগন মোস্তফাপুর, গবিন্দশ্রী, ধরকাপন, হিলালপুর, দরগা মহল্লা এলাকার সৈয়দ সাহেবগন এই পীরে কামেলের বংশধর বলে জানা যায়। তাঁর নামেই মোস্তফাপুর ইউনিয়ন, শাহ্ মোস্তফা সড়ক, কালেক্টারেট ভবন সমুখস্থ বিশাল শাহ্ মোস্তফা স্কোয়ার, সৈয়দ শাহ্ মোস্তফা কলেজ বিদ্যমান।

প্রত্যেক বৎসর ষোলই জানুয়ারী এই পীরে কামেলের বার্ষীক ওরশ শরীফ উৎসাহ উদ্দীপনাও ধর্মীয় ভাব গম্ভীর পরিবেশে উদ্যাপিত হয়। জিগির, আজগার, এবাদত, বন্দেগী, জিয়ারত হয়। অর্ধ সপ্তাহ ব্যাপী বিশাল মেলা বসে দরগা মহল্লা এলাকায়। লাখো মুসল্লির জিগির আজগার এ মুখরিত হয় মাজার এলাকা, লাখো মুসল্লীর উচ্ছল পদ বারে প্রকম্পিত হয় সমগ্র শহর। শাহ মোস্তফার বার্ষীক ওরশ শরীফে কোন ইসলাম বিরোধী কাজ হয় না। ভন্ড পিরানী কিংবা লালসালুওয়ালা গঞ্জিকা সেবীদের প্রাদূর্ভাব নেই এখানে। এ ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন ও ওরশ উদ্যাপন কমিটি কঠিন, কঠোর মনোভাব পোষন করেন। প্রশাসন জনগনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আইন শৃংঙ্খলা পরিস্থিতি বরাবরই নিয়ন্ত্রনে থাকে।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর খ্যাতিমান পীরে কাামেল হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা সেরে সওয়ার চাবুকমার বোগদাদী স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। ওরশে আগত লাখো মেহমান মুছল্লিয়ানকে-আহ্লান-ওয়া-ছাহলান। ওলির ৬৭৯তম বার্ষীক ওরশ সফল হউক-এই মোনাজাত সহ আমীন। ছুম্মা আমীন।

[সেক্রেটারি জেলা জামে মসজিদ। সিনিয়র এডভোকেট, হাইকোর্ট, মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সভাপতি, মৌলভীবাজার প্রেসকøাব। কলামিষ্ট।]

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”