বড়লেখায় পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের দূর্ভোগ চরমে : কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি চক্র বেপরোয়া বাণিজ্যে লিপ্ত

জুলাই ১০, ২০১৮, ২:১৯ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ১০৩ বার পঠিত

বড়লেখা প্রতিনিধি॥  বড়লেখায় এক গ্রাহকের বৈদ্যুতিক মিটার লুকিয়ে খুলে নিয়ে চারদিন পর টাকার বিনিময়ে মিটারটি পূণরায় স্থাপন করে দেয়া হয়। এমন অভিযোগ উঠছে পল্লী বিদ্যুতের বড়লেখা আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক ইঞ্জিনিয়ার,কর্মকর্তা ও এক লাইন ম্যানের বিরুদ্ধে।

অবৈধ বলে পল্লী বিদ্যুতের লোকেরা তাদের মিটার খুলে নিয়েছে,এমন সমালোচনায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় গ্রাহকের সম্মান ক্ষুন্ন হয়েছে।  তীব্র গরমে পরিবারের সদস্যদের কষ্ট দিয়ে অমানষিক শাস্তি প্রদাণ, হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে।

অভিযোগকারী সূত্রে জানা যায়, ২১ জুন উপজেলার গ্রামতলার লন্ডন প্রবাসী আপ্তাব আলীর বাড়ির বৈদ্যুতিক মিটারটি বোর্ডসহ বাড়ির লোকজনের অলক্ষ্যে খুলে নেয় পল্লী বিদ্যুতের  দু‘ব্যক্তি। বাড়িতে থাকা আপ্তাব আলীর বড় ভাই‘র স্ত্রী জানান,এ সময় কেউ বাড়িতে ছিলেন না। তিনি পাশের বাড়ি থেকে ফেরার পথে দেখতে পান পল্লী বিদ্যুতের দু‘ব্যক্তি বোর্ডসহ একটি মিটার নিয়ে মোটর সাইকেলে চলে যাচ্ছে। ঘরে ফ্যান চালাতে গিয়ে লক্ষ্য করেন তা চলছে না। পাশের ঘরে ফ্যান চলার শব্দ শুনে তিনি মিটার বোর্ডের স্থানে গিয়ে দেখেন তাতে মিটারটি নেই। এতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে তীব্র গরম আর বিদ্যুৎহীতায় চার দিন ধরে চরম ভূগান্তি পোহাতে হয় পরিবারের সদস্যদের। অবৈধ হওয়ার কারণে পল্লী বিদ্যুতের লোকেরা তাদের মিটার খুলে নিয়েছে,এমন সমালোচনা ছড়ায় এলাকায়। এরপর টাকার বিনিময়ে মিটারটি বসিয়ে দিতে বিভিন্ন মাধ্যমে তারা বাড়ির মালিক মঈন উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করে। অতঃপর ২৪ জুন পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যান রেজাউল করিম বাড়িতে গিয়ে মিটারটি পূণঃসংযোগ দিতে বিশ হাজার টাকা দাবি করেন। অন্যতায় অফিসিয়ালি মিটারটি আনতে মামলাসহ নানা ঝক্কি-ঝামেলায় ৬০/৭০ গুনতে হবে। মামলা, জরিমানার পরিমাণ, গরমের কষ্ট আর সন্তানদের লেখাপড়ার কথা ভেবে মঈন উদ্দিন অর্ধেক টাকা দিতে সম্মত হয়ে কাকুতি-মিনতি করেন। লাইনম্যান বলেন বিষয়টি এজিএম কম স্যার ও ইঞ্জিনিয়ার স্যার জানেন। তাদেরকে পাঁচ হাজার টাকা করে দিতে হবে। বকেয়া বিল ও সংযোগ ফি দেয়ার পর যে টাকা থাকবে তাতে তার পুষাবে না। পরবর্তীতে কি ভেবে লাইনম্যান রেজাউল করিম রাজি হয়ে বিদ্যুৎ বিলের কাগজ আর নগদ তিন হাজার টাকা নেন। অবশেষে ঐ দিন বিকেলে মিটারটি পূনঃস্থাপন করে দিলে লাইন ম্যানকে আরো পাঁচ হাজার টাকা দেন। ভাঙ্গা বোর্ডেও টুকরার উপর চাবি ছাড়া  মিটারটি বসিয়ে দেয়া হয়েছে বলে মঈন উদ্দিন জানান । তদন্তে গিয়ে পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএমও তা দেখে এসছেন।

লন্ডন প্রবাসি আপ্তাব আলী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় জানান, পিডিবির সময়কার বিদ্যুত লাইনে পল্লী বিদ্যুৎ খুঁটি,সার্ভিস ড্রপ তারসহ মিটার সংযোগ দিয়েছে। যার হিসাব নং ৬৩২/১৭২০। ২০ বছর পর তাদের লোকজন অবৈধভাবে মিটার খুলে নিলে আমার সামাজিক মান সম্মান ক্ষুন্ন করেছে। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় তার পরিবারকে হয়রানি ও অমানবিক শাস্তি প্রদান করেছে। বিষয়টি সংস্থার উচ্চ পর্যায়ে জানিয়ে আদালতে মামলা করতে তিনি তার ভাই মঈন উদ্দিনকে বলে দিয়েছেন।

লাইনম্যান রেজাউল করিম জানান,তিনি শুধু আদেশ পালন করেছেন। আলাপকালে মিটারটি খুলে নেয়ার ব্যাপারে বড়লেখা পল্লী বিদ্যুতের জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার বিদ্যুৎ দাস জানান,মিটারটি অবৈধ সন্দেহ হওয়ায় খুলে আনা হয়েছিল। তবে বিষয়টি কম স্যারের জানা ছিল। তবে মিটার আনার আগে সে ব্যক্তি সম্পর্কে খোঁজ না নিয়ে আনাটা ভুল ছিল।

 বড়লেখা পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম সুজিত কুমার বিশ্বাস অভিযোগ প্রাপ্তির সত্যতা স্বীকার করে জানান, তিনি অবগত হওয়ার পরই খুলে আনা মিটারটি পুনঃস্থাপনের নির্দেশ দেন। এবং এর তদন্ত চলছে বলে জানান।

অপর দিকে, পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়সহ এলাকায় ঘটনাটি জানাজানি হলে এ নিয়ে তোলপাড় চলছে। বেরিয়ে পড়ছে এমন নানা অবৈধ পন্থায় গ্রাহকদের মিটারের চাবি ভেঙ্গে, মিটার খুলে নিয়ে জরিমানা ভীতি দেিেখয়ে বাইরের দালাল চক্রের যোগসাজশে দফারফা করে গ্রাহক হয়রানি করার নানা ঘটনা। তবে ভয়ে কেউ অভিযোগ বা প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না পাছে যদি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়সহ নানাসূত্র জানায়, মিটার ফি ৬০০টাকার বেশী নয় গ্রাহকদের সচেতন করতে এমন প্রচারণা চলছে দীর্ঘ দিন থেকে। পল্লী বিদ্যুতের বোর্ড চেয়ারম্যানের এমন আদেশ বাস্তবায়নে জেপুটি জেনারেল ম্যানেজার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

বড়লেখা সাবস্টেশনের ধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে করা হযেছে ২০ কেভি। প্রায় সাড়ে তেরশ কিলোকিমটার বিদ্যুৎ লাইন রয়েছে। গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজারের অধিক। প্রতিদিন প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াও মফস্বলের গ্রাহকরা ২/৩ ঘণ্টা করে গড়ে বিদ্যুৎহীন কাটাতে হয়। এ কারণ হিসেবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিস সংশ্লিষ্টরা জানায়, প্রায় সাড়ে তের‘শ কিলোমিটার লাইনের  জন্য লাইনম্যান রয়েছে মাত্র ১৩ জন। অফিস স্টাফও অপ্রতুল। বিদ্যুৎ সেবা দিতে সার্ভিস লাইন নিয়ে হিমসিম খেতে হয়। এত দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি দেখা দেয় যে কোন সময়। এতে গ্রাহকদের অসন্তুষ্টি-অভিযোগ বাড়ে। এর মধ্যে অফিসে কড়াকড়ি আরোপ করায় বহিরাগতদের যোগসাজশে বাড়তি আয়ের ধান্দায় গড়ে উঠে একটি চক্র। নানা ভাবে  গ্রাহক হয়রানি করে,তিন/হার হাজার টাকা চুক্তিতে মিটার সংযোগ দিয়ে বাড়তি আয়ে লিপ্ত চক্রটি। তাদের লাগাম টেনে ধরতে অফিস কর্তা ব্যর্থ। এমন কি এক ইঞ্জিনিয়ার অফিস রোস্টার ভেঙ্গে লাইনম্যানদের দিয়ে চুক্তিবদ্ধ কাজ করিয়ে নেন। এ নিয়ে অফিসে একে অন্যে বাদানুবাদের ঘটনাও ঘটে। আলাপকালে ডিজি এম সুজিত কুমার বিশ্বাস জানান,চেইন অব কমা- ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তবে ভালমন্দ মিলিয়ে সবাইকে নিয়ে গ্রাহকদের সেবা দিতে চেষ্টার কমতি নেই।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”