মুক্তিযোদ্ধা স্বামীর স্বীকৃতির জন্য বিধবা স্ত্রীর আকুতি

এপ্রিল ১৭, ২০১৯, ৩:৩৮ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ৬৩ বার পঠিত

কুলাউড়া প্রতিনিধি॥ মুক্তিযোদ্ধা স্বামীর স্বীকৃতি নিয়ে মরতে চান কুলাউড়ার মমতাজ হাসান। সম্মুখ সমরে জীবন বাজি রেখে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেও মো. শাহাব উদ্দীন আহমদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারেননি। এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তীতে পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক শেখ ফজলুল হক মনির স্বাক্ষরিত একটি ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র’ পেলেও যার কোন মূল্য পাননি তিনি।

প্রায় এক যুগ আগে মারা গিয়েছেন তিনি। এখন তাঁর অসহায় স্ত্রীর আকুতি স্বামীর জীবদ্দশায় না পাওয়া মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া দেখে মরতে চান তিনি।

জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের রনচাপ গ্রামের আছদ আলীর ছেলে মো. শাহাব উদ্দীন আহমদ। তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন বীর সেনানী ছিলেন।

৭১ এর জুন-জুলাই মাসের শেষের দিকে ভারতের একটি ক্যাম্পে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। প্রায় দেড় মাস পর দেশে ফিরে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে দেশকে শত্রু মুক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধের এগারোটি সেক্টরের একটি পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক ও গেরিলা বাহিনী মুজিব বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

দেশ স্বাধীনের পর নিজ উপজেলা কুলাউড়া শহরে একটি ট্রাভেলস ব্যবসায় জড়িত হয়ে পড়েন। জীবিত থাকাবস্থায় প্রথমদিকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাবার জন্য চেষ্টা করেন নি। কিন্তু যখন চেষ্টা করেন তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। গত ২০০৭ সালের ১৭ মার্চ দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুলাউড়া পৌর শহরের দক্ষিণ মাগুরাস্থ মো. শাহাব উদ্দীন আহমদের শ্বশুরালয়ে বসবাস করছেন তাঁর স্ত্রী মমতাজ হাসান ও একমাত্র সন্তান  সাহান আহমদ রুহিত । শাহাব উদ্দীন জীবিত থাকাবস্থায় ভাড়া বাসায় বসবাস করলেও উনার মৃত্যুর পর থেকেই তারা এই বাসায় বসবাস করছেন।

স্ত্রী মমতাজ হাসান বলেন, তিনি ছিলেন উদার মনের মানুষ। ব্যবসা করে জীবনে যা আয় করেছিলেন তা খাওয়া-দাওয়া করে শেষ করে দিয়েছেন। ট্রাভেলস ব্যবসায় জড়িত থাকলেও মৃত্যুর সময় উনার প্যান্টের পকেটে পেয়েছিলাম প্রায় ৪ শত টাকা। আর দুইটি ব্যাংক হিসাব ছিলো। এর একটি পূবালী ব্যাংকে ছিলো ১৫০০ টাকা আর সাউথ ইস্ট ব্যাংকে ছিলো ১৮০০ টাকা। যা উত্তোলন করতে এর থেকেও বেশি টাকা খরচ করতে হয়। তাই টাকাগুলো ব্যাংকেই পড়ে আছে। এটাই ছিলো তাঁর মৃত্যুকালে শেষ সম্বল।

তিনি বলেন, উনার মৃত্যুর পর থেকেই আমি ও সন্তান আমার পিতার বাসায় বসবাস করছি। ভাই-বোনদের সহযোগিতায় সন্তানকে নিয়ে বেঁচে আছি। উনাকে (মুক্তিযোদ্ধা শাহাব উদ্দিন) নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোন আক্ষেপ নেই। আক্ষেপ একটাই উনি এই দেশের জন্য যুদ্ধ করলেন কিন্তু জীবদ্দশায় তার স্বীকৃতি পেলেন না। উনার মৃত্যুর পর আমরা অনেকের শরণাপন্ন হয়েছি কিন্তু প্রায় সবাই অনৈতিকভাবে উৎকোচ-ঘুষ দাবি করে। আমাদের একটাই চাওয়া, উনি যে দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন সেই দেশে উনাকে রাষ্ট্রীয় সেই ‘মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতিটা দেয়া হোক।

জানা যায়, স্বাধীনতা যুদ্ধে মো. শাহাব উদ্দিন আহমদ স্বশরীরে অংশগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আপন ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে গেরিলা বাহিনী ‘মুজিব বাহিনী’র একজন সদস্য হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ও আঞ্চলিক অধিনায়ক শেখ ফজলুল হক মনির স্বাক্ষরিত ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র’ দেয়া হয় তাঁকে। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে এই সনদ নিয়ে তিনি দৌড়ঝাঁপ করেন নি। রেখেছিলেন ঘরের সিন্দুকের ভিতর যতœ করে। তাঁর চোখের সামনে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি নিয়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এতে তাঁর কোন মোহ ছিলো না। শেষ বয়সে এসে উপলব্ধি করেন এই স্বীকৃতিটা রাষ্ট্রীয়ভাবে পাওয়া দরকার। কিন্তু অনেক চেষ্টার পর তিনি তা পেতে ব্যর্থ হোন। একসময় তিনি দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে ২০০৭ সালে মারা যান।

স্ত্রী মমতাজ হাসান বলেন, বাবার রেখে যাওয়া বাসায় ভাইয়ের সাথে বাস করছি আমি ও আমার সন্তান। উনি ব্যক্তিজীবনে অনেক সৎ এবং সরল ছিলেন। তাই মৃত্যুকালে শেষ সম্বল হিসেবে কিছুই রেখে যেতে পারেন নি। উনার শেষ সময় ইচ্ছা ছিলো, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রাপ্তি। সময় এবং ভাগ্য উনার সহায় ছিলো না। স্বীকৃতি না পাওয়ার যে আক্ষেপ নিয়ে উনি মৃত্যুবরণ করেছেন সেই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে আমাদের এই চাওয়া। স্বীকৃতিটা পেলে হয়তো ওপারে থেকেও উনার আত্মা শান্তি পাবে।

মুক্তিযোদ্ধা শাহাব উদ্দিনের সন্তান সাহান আহমদ রুহিত বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর মামা-খালাদের সহযোগিতায় আমরা নানার বাসায় বসবাস করছি। মা অনেক কষ্ট করে আমাকে লালন পালন করছেন। কিন্তু কোন দিন বাবার উপর উনাকে আক্ষেপ করতে দেখিনি। বাবা একজন আদর্শবান, সৎ ও কর্মঠ ব্যক্তি ছিলেন। আত্মসম্মানবোধ ছিলো প্রখর। তাই হয়তো এই স্বীকৃতির জন্য কারও কাছে যেতে লজ্জাবোধ করতেন।

সাহান আহমদ রুহিত বলেন, স্বাধীনতার পর তৎকালনি রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমার বাবাকে যিনি মুক্তিযুদ্ধের সনদ দিয়েছিলেন তিনি জাতির জনকের আপন ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি। আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। আজকের প্রধানমন্ত্রীর আপন ফুফাতো ভাইয়ের স্বাক্ষরিত সনদটি তিনি একবার যাচাই করে অন্তত বিষয়টি বিবেচনায় নিবেন, এটা আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।

এবিষয়ে জানতে চাইলে কুলাউড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমা-ার সুশীল চন্দ্র দে বলেন, প্রতি ৩ মাস পরপর মুক্তিযোদ্ধা তালিকা হালনাগাদের কাজ করা হয়। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”