(ভিডিওসহ) মৌলভীবাজারের পাহাড়ি ঢলে মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ১৩ স্থান ভেঙ্গে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত

জুন ১৩, ২০১৮, ৮:৩৫ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ১,২৫০ বার পঠিত

স্টাফ রিপোর্টার॥ কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ১৩ টি স্থান ভেঙে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করে বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছে।
কুলাউড়া উপজেলায় টিলাগাঁও, শরিফপুর ও হাজীপুর ইউনিয়নের ৫টি ভাঙ্গন ও কমলগঞ্জ উপজেলার কমলগঞ্জ পৌর এলাকা, মুন্সীবাজার ইউনিয়ন, আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের ৮টি ভাঙ্গন দিয়ে প্রবেশ করছে বন্যার পানি। তলিয়ে গেছে এ সব এলাকার বাড়ি ঘর, রাস্তা ঘাট সহ ফসলী জমি। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন ওই এলাকার অন্তত লক্ষাধিক মানুষ।
বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ায় অনেকেই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন।
বন্যার পানিতে নিমজ্জ্বিত থাকায় শমসের নগর-চাতলাপুর ইমগ্রেশন চেকপোষ্ট সড়ক, মুন্সীবাজার-কমলগঞ্জ-কুরমা সড়ক ও শমশেরনগর-কুলাউড়া সড়কের একাংশ তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এসব সড়কে কোথাও কোথাও দেড় থেকে ৩ ফুট বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে যানবাহন চলাচলে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে।
এদিকে মনুনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে মঙ্গলবার রাতে কুলাউড়ার শরীফপুর ইউনিয়নের বাঘজুর ও তেলিবিল গ্রাম এলাকায়, বুধবার সকালে চাতলাপুর সেতুর উত্তরপাশে ও দুপুরে হাজীপুর ইউনিয়নের মিঞারপাড়া এলাকায় নদীভাঙনের ফলে পানি দ্রুত গতিতে গ্রামে প্রবেশ করে। ফলে ১৫টি গ্রামের প্রায় ৪ হাজার মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েন। শরীফপুরের বটতলা থেকে চাঁনপুর পর্যন্ত প্রায় ২ কি.মি. সড়ক ৩ ফুট পরিমাণ পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় এবং কুলাউড়া-শমশেরনগর সড়কে টিলাগাঁও এলাকায় সড়কে পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় কুলাউড়া-শমশেরনগর ও বাংলাদেশ-ভারত সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
মৌলভীবাজার-২ আসনের সাংসদ আব্দুল মতিন, কুলাউড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোঃ গোলাম রাব্বি শরীফপুর ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শণ করেন।
সাংসদ আব্দুল মতিন, উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম ও নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোঃ গোলাম রাব্বি বলেন, এ ইউনিয়নের পানিবন্ধী মানুষজনের জন্য জরুরী ভিত্তিতে ত্রাণ প্রদানসহ আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া পানি কমলে ও জরুরী ভিত্তিতে সড়ক যোগাযোগ চালু রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনে কাজ করা হবে বলেও তারা জানান।
কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ জনাব আলী বলেন, মঙ্গলবার শবেকদরের রাত সাড়ে ৮টায় আমতলা বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন মনু প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙ্গন শুরু হলে গ্রামবাসী ও বিজিবি সদস্যরা মিলে শতাধিক বস্তা বালু দিয়ে এ স্থান রক্ষা করেন। তবে রাত আড়াইটায় বাঘজুর ও তেলিবিল গ্রাম এলাকার প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে দ্রুত গতিতে ঢলের পানি গ্রামে প্রবেশ করে। এ পানি বসতঘর সহ ফসরি জমি তলিয়ে নেয়। বাঘজুর, তেলিবিল, চাঁনপুর, খাম্বারঘাট, শরীফপুর, বটতলা, সঞ্জরপুর গ্রামের ২ হাজার মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েন।
মুন্সীবাজার ইউনিয়ন ও কমলগঞ্জ পৌর এলাকায় শতাধিক কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। সহ¯্রাধিক হেক্টর আউশ ফসল পানিতে নিমজ্জ্বিত রয়েছে। অপরদিকে ভানুগাছ বাজার সংলগ্ন, রামপাশা, আলেপুর এলাকায় আরো ৩টি স্থান ঝুঁকির মুখে। বুধবার দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কমলগঞ্জ পৌরসভা ও মুন্সীবাজার ইউনিয়নের ১২৫টি পানিবন্দি পরিবারের মাঝে জরুরী ভিত্তিতে ১০ কেজি করে জিআর চাল বিতরণ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার ও মঙ্গলবার দুই দিন দুই রাত অবিরাম মাঝারী বৃষ্টিপাতে ধলাই নদীর কমলগঞ্জ পৌরসভার করিমপুর, মুন্সীবাজার ইউনিয়নের সুরানন্দপুর, বাদে করিমপুর, রহিমপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর, আদমপুর ইউনিয়নের কেওয়ালীঘাট, ঘোড়ামারা, মাধবপুর ইউনিয়নের কাটাবিল, ইসলামপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর নামক স্থানে ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধের পুরাতন ও নতুন ভাঙ্গন দিয়ে ৬টি ইউনিয়নের করিমপুর, ঘোড়ামারা, বাসুদেবপুর, সুরানন্দপুর, বাদে করিমপুর, বনগাঁও, ধলাইরপার, শ্রীপুর, ঘোড়ামারা, হীরামতি, যুদ্ধাপুর, নাগড়া, গোপালনগর, নাজাতকোনা, কেওয়ালীঘাট, কান্দিগাঁও, হোমেরজানসহ ৫০টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। পানিতে ফসলী জমি তলিয়ে গেছে। এছাড়া ধলাই নদীর মাধবপুর ইউনিয়নের হীরামতি গ্রামের মেরামতকৃত বাঁধ ও কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চৈতন্যগঞ্জ এবং রামপাশা গ্রামে খুবই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। টানা বর্ষনে ধলাই নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
কমলগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো. জুয়েল আহমদ বলেন, করিমপুর এলাকায় নদীর ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করায় পৌর এলাকার গোপাল নগর, করিমপুর, যুদ্ধাপুর ও নাগড়া গ্রামের তিনশ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এসব এলাকায় প্রাথমিকভাবে কিছু ত্রাণ সামগ্রী বিতরন চলছে।
মুন্সীবাজার ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালিব তরফদার জানান, ধলাই নদীর বাদে করিমপুর ও সুরানন্দপুর এলাকায় সৃষ্ট ভাঙনে প্রায় ৮০টি পরিবার বিধ্বস্ত হয়েছে। ৫ শতাধিক হেক্টর আউশ ফসল পানিতে নিমজ্জ্বিত রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলাতির কারণে যথাসময়ে ধলাই নদীর ভাঙন মেরামত না করায় এবার বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। ধলাই নদীর ভাঙ্গা বাঁধ মেরামতের জন্য জরুরী ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোর দাবী জানান।
আদমপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন জানান, নদীর একাধিক স্থানে ভাঙনের ফলে ঘোড়ামারা, খেওয়ানিঘাট, কান্দিগাঁও, বন্দরগাঁও, মধ্যভাগ, হেরেঙ্গাবাজার গ্রামের প্রায় আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নদীর পানি এখন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, করিমপুর এলাকার প্রায় দেড়শ ফুট ভাঙন পরিদর্শন করেছি। এছাড়া পুরনো কয়েকটি ভাঙন দিয়ে পানি বেরুচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন এ দিকে সতর্কতার সাথে নজরদারী করছে। আপাতত কয়েকটি এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী বিতরন করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোঃ তোফায়েল ইসলাম জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তাৎক্ষনিক বিতরণের জন্য কুলাউড়া উপজেলায় ৫০ টল, কমলগজ উপজেলায় ৪৫, রাজনগরে ১০ টন ও শ্রীমঙ্গলে ৫টন চাল বরাদ্ধের পক্রিয়া চলছে। এ ছাড়াও কুলাউড়া ও কমলগঞ্জে নগদ এক লক্ষ টাকা বরাদ্ধ করা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী শরীফপুরে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ৪ টি স্থানের ভাঙ্গনের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ভারতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে যা এখনও বৃষ্টি অভ্যাত রয়েছে। মনুনদীর বাঁধ উপচিয়ে পানি এসে বাঁধ ভেঙ্গেছে। নদীতে পানির গতি অত্যাধিক। মনু নদীর পানি মনু রেলওয়ে ব্রীজের কাছে বিপদ সীমার ১৭৭ সেঃ মিঃ, শহরের চাঁদনীঘটে ৪৫ সেঃ মিঃ ও কমলগঞ্জের ধলাই নদীর পানি ৫৩ মিটার উপর দিয়ে প্রভাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অভ্যাহত থাকলে মনুনদীর শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ উপচিয়ে পানি প্রবেশ করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”