শ্রীমঙ্গলে চালু হচ্ছে দেশের ২য় চা নিলাম কেন্দ্র ॥ আর এটি চালু হলে দেশের মানুষ গুনগত ও সাশ্রয়ী মুল্যে চা পান করতে পারবেন অভিমত চা সংশ্লিষ্টদের

ডিসেম্বর ৭, ২০১৭, ১১:৪২ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ১,১০০ বার পঠিত

বিকুল চক্রবতী॥ দীর্ঘ দিনের আন্দোলন সংগ্রামের ফসল হিসেবে এবং প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত দেশের ২য় চা নিলাম কেন্দ্র চালু হচ্ছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। আর এ চা নিলাম কেন্দ্র চালু হলে দেশের চা-পায়ীরা পাবেন গুনগত মানের সাশ্রয়ী মুল্যের চা। লাভবান হবে সিলেট বিভাগের চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্টানগুলোও জানান, চা সংশ্লিষ্ট জনেরা।

ইতিমধ্যে শ্রীমঙ্গলে সম্পন্ন হয়েছে চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের সকল প্রস্তুতি। এখন উদ্বোধনের সেই মহেন্দ্র ক্ষনের অপেক্ষায় আছেন বলে জানান, শ্রীমঙ্গল ক্লোনেল চা বাগানের মালিক সৈয়দ মনসুরুল হক ও চা নিলাম বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব জহর তরফদার।

একসময় দেশের উৎপাদিত ৯০ ভাগ চা-ই বিদেশে রপ্তানি করা হতো। আর সমুদ্র বন্দরের কারনে চট্টগ্রামে স্থাপন করা হয় চায়ের অকশন হাউজ। বর্তমানে দেশে চায়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আর রপ্তানি হয় না বলে জানান, বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট ব্রান্স চেয়ারম্যান জি এম শিবলী।

মৌলভীবাজার এম আর খান চা বাগানের মালিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, সিলেটের চা বাগান গুলোর ফেক্টরী থেকে চা ট্রাকে লোড করে কয়েক রাউন্ড তেরপাল ও পলিথিন মুড়িয়ে তার পর সিলগালা করে নিলামে উঠানোর জন্য পাঠানো হয় চট্টগ্রাম অকসন হাউজে। কিন্তু এতে পোহাতে হয় নানান বিপত্তি। কখনও পথে হয় চুরি, বৃষ্টির সময় চায়ে জমে মহেসচার। ট্রান্সপোর্টের কারনে সময়মতো অকসনে অনেক বাগান অংশগ্রহনও করতে পারেন না। আর এ থেকে পরিত্রান পেতে বিগত ৩০ বছর ধরে  শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের দাবী জানিয়ে আসছেন এ এলাকার মানুষ।

বিটিআরআই এর  প্রাক্তন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকতা চা বিজ্ঞানী- শাহ্ কামাল লানচু হক জানান, শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র হচ্ছে জেনে তিনি খুব খুশি। তিনি জানান, তিনি যখন চা গবেষনা কেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন তখন এ এলাকার চা ব্যবসায়ী, চা বাগান মালিকরা দাবী করে আসছিলেন শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের। আর তাদের দাবীটিও নায্য ছিলো কারণ চায়ের মুল উৎপাদনের প্রায় ৯০ ভাগই সিলেট বিভাগে উৎপাদিত হয় সেহেতু শ্রীমঙ্গলেই চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপন তাদের যৌক্তিক দাবী । সে সময় একবার উদ্যোগ গ্রহন করাও হয়েছিলো কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর বাস্তবায়ন করা যায়নি। তাছাড়া বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামে চা পাঠানোর সময় চায়ে মহেসচার সংযুক্ত হয়ে চায়ের গুনগত মান কমে যায়।

তবে দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২৪ নভেম্বর বানিজ্য মন্ত্রনালয় কর্তৃক শ্রীমঙ্গলে দেশের ২য় চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন পায় টি প্লান্টার্স এন্ড ট্রেডার্স এসোসিয়েশন। ওই দিন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন ও টি প্লান্টার্স এন্ড ট্রেডার্স এসোসিয়েশন এর উদ্যোগে চা এর অকশন হাউজের সাথে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় এক মত বিনিময় সভা। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদেন বানিজ্য মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ আব্দুর রউফ, এমবিএ (ইউএসএ) ও বিশেষ অতিথি ছিলেন-বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো.ওবায়দুল আযম, সাবেক এমপি ও মুক্তিযোদ্ধা মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুর রহমান, কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ও কমলগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক রফিকুর রহমান, শ্রীমঙ্গল উপজেলা চেয়ারম্যান রণধীর কুমার দেব, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নেছার আহমদ,সাধারণ সম্পাদক মোঃ মিছবাউর রহমান, মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র ফজলুর রহমান,কুলাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম, প্রমুখ।

এ সময় সভায় উপস্থিত চা শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চা বাগানের মালিক, চা ব্যবসায়ী, চা শিল্পের সাথে জড়িত দেশের বিভিন্ন গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন এবং ডিসেম্বর ২০১৭ সালের মধ্যেই চা নিলামকেন্দ্র চালুর ব্যাপারে একমত পোষণ করেন তারা।

এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত সচিব মোঃ আব্দুর রউফ বলেন, সিলেট চায়ের দেশ, সিলেটবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবী ছিলো শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের সমস্ত দাপ্তরিক কর্মকান্ড ইতিমধ্যে উনার মন্ত্রনালয় থেকে সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে।

ওই দিন তিনি শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের লজিষ্টিক সার্পোট গুলো ঠিক আছে কিনা তাও পরিদর্শন করেন এবং পরিদর্শন শেষে তা চা নিলাম কেন্দ্রের উপযোগী বলেও তিনি মনে করেন বলে জানান। তিনি জানান, তাদের দিকদিয়ে তারা প্রস্তুত, এখন সরকার সুবিধামতো সময়ে তা উদ্বোধন করতে পারবেন।

এদিকে শ্রীমঙ্গলে দেশের ২য় চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়ায় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান, মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোঃ নেছার আহমদ। তিনি জানান, ২০১২ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে শ্রীমঙ্গলের ভাষনে, পরে মৌলভীবাজারের ভাষনে শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতিদেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চা বোর্ড, শ্রীমঙ্গল চা নিলাম বাস্তবায়ন পরিষদ ও বানিজ্যমন্ত্রনালয় দীর্ঘ কর্মযজ্ঞের পর শ্রীমঙ্গলের চা নিলাম কেন্দ্রকে এখন উদ্বোধনের মহেন্দ্র ক্ষনে নিয়ে এসেছেন।  বর্তমানে তারা সেই মহেন্দ্র ক্ষনের অপেক্ষায়।

টি প্লান্টার্স এন্ড ট্রেডার্স এসোসিয়েশন এর নেতা শেখ লুৎফুর রহমান জানান, বিগত ৪ বছর ধরে অকশন সেন্টার, ওয়ার হাউজ, ব্রোকার হাউজ তৈরী করে তারা ভাড়া প্রদান করে আসছেন। যত দ্রুত সম্ভব এটি উদ্বোধন ততই তাদের জন্য মঙ্গল।

এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ তোফায়েল ইসলাম জানান,

মৌলভীবাজারকে বলা হয় চায়ের দেশ এবং শ্রীমঙ্গলকে বলা হয় চায়ের রাজধানী। মৌলভীবাজার জেলায় ৯৩টি চা বাগন রয়েছে। তাই এ জেলাই চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপন সময়ের দাবী। এখানে চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপিত হলে চা বাগান মালিকরা যেমন লাভবান হবেন তেমনি লাভবান হবেন যারা চায়ের ক্রেতারাও। আর বর্তমান সরকার সে আলোকেই কাজ করছে।

অন্যদিকে শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র হলে চা পাতার দাম কমবে বলে জানান শ্রীমঙ্গলের চা বিক্রেতারাও। শ্রীমঙ্গল গুপ্ত টি এর মালিক পীযুশ কান্তি দাশগুপ্ত ও গ্রীণলিফ টির মালিক কৃষ্ণ সেন বলেন, শ্রীমঙ্গলে চা এর অকশন সেন্টার হলে তাদেরকে আর চট্টগ্রাম থেকে চা আনতে হবে না। শ্রীমঙ্গলের চা শ্রীমঙ্গল থেকেই ক্রয়করতে পারবেন। এতে চা বাগান মালিকদের যেমনি চট্টগ্রাম পাঠানোর পরিবহন খরচ ও সময় বাঁচবে তেমনি তাদেরও চট্টগ্রাম অকশন হাউজ থেকে শ্রীমঙ্গলে চা নিয়ে আসার পরিবহন খরচ ও সময় বেঁচে যাবে। এতে চায়ের দাম কিছুটা কমবে। বর্তমানের চেয়ে একটু কমমুল্যে চা পান করতে পারবেন দেশের চা পিপাসুরা।

আর সিলেটবাসীর দাবী এই ডিসেম্বের মাসে এটি উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বিজয়ের মাসের উপহার হিসেবে তা পেতে চান তারা ।

 

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন