শ্রীমঙ্গলে বিজিবি হামলা তদন্ত কমিটির সমন্বয়হীনতার কারণে এক বছরেও ক্ষতিপূরণ পায়নি ক্ষতিগ্রস্থরা

জানুয়ারী ৪, ২০১৮, ৯:৫৬ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ১৫০ বার পঠিত

শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি॥ গত বছরের ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি তারিখে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ঘটে যাওয়া বিজিবি’র হামলার ঘটনায় ৪ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করার পর দীর্ঘ এক বছরেও ক্ষতিপূরণ পায়নি ক্ষতিগ্রস্থরা। কথা ছিল ওই বছরের ১৪ জানুয়ারি’র মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে। কিন্তু তা না হয়ে তড়িঘড়ি করে ১৫ দিনের মাথায় ওই তদন্ত কমিটির ৪ জনের মধ্যে ৩ জনই তাদের কর্মস্থল থেকে অন্যত্র বদলী হয়ে গেছেন। এদিকে তদন্ত কমিটি সুষ্ঠভাবে তদন্ত করতে পেরেছে কিনা বা আদৌ তা বাস্তবায়িত হবে কিনা এ নিয়ে হতাশায় ভূগছেন শ্রীমঙ্গলের ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক-মালিক ও অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্থরা।

শ্রীমঙ্গলে বিজিবি সদস্যদের দ্বারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যানবাহনসহ সাধারণ পথচারীদের উপরে গুলি বর্ষণ এবং অমানবিক নির্যাতন ও লুটপাটের ঘটনায় মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ তোফায়েল ইসলামের তত্ত্বাবধানে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ ফারুখ আহমেদকে প্রধান করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ শহীদুল হক ও শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ মাহবুবুর রহমানকে নিয়ে ৪ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

বলা হয়েছিল, ৭ জানুয়ারি থেকে ১৪ জানুয়ারির ভেতরে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে সকল তদন্ত কাজ শেষ করে বিজিবি’র উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে। কিন্তু তদন্ত কাজ কিছুটা এগুতে না এগুতেই ওই কমিটির ৪ জনের ৩ জনই বদলী হয়ে যান।

পরবর্তীতে মৌলভীবাজারে যোগ দেয়া অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মীর মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানকে প্রধান করে অতিরিক্ত প্রশাসন সুপার আনোয়ার হোসেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মোবাশশেরুল ইসলাম ও শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার ইনচার্জ কে এম নজরুল এই চারজনকে নিয়ে পুণঃরায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতের দেখা দেয় ধীর গতি। এদিকে তদন্ত কমিটির সমন্বয়হীনতার কারণে দীর্ঘ ১ বছরেও ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব হয়নি বলে ধারণা ক্ষতিগ্রস্থদের।

এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির সদস্য শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মোবাশশেরুল ইসলাম জানান, বিগত কমিটির প্রধান মোঃ ফারুখ আহমেদ এখন পর্যন্ত বর্তমান কমিটির কাছে কোন কাগজপত্র হস্থান্তর করেন নি। বিধায় বর্তমান কমিটি এই তদন্ত কাজে এগুতে পারছে না।

তদন্ত কমিটির সদস্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন- আমাদের তদন্ত কাজ প্রায় শেষ। সর্বশেষে ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে বিজিবির উর্ধ্বঃতন কর্তৃপক্ষের সাক্ষাৎকার চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে পূর্বের কমিটি একটি আবেদন করেছিল। কিন্তু ওই আবেদনের সঠিক কোন জবাব না পাওয়ায় ক্ষতিপূরণ আদায়ে ভাটা পরে।

এদিকে বিগত তদন্ত কমিটির প্রধান মোঃ ফারুখ আহমেদ জানান, তিনি দায়িত্বরত থাকাকালীন সময়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা চেয়ারম্যানের সহকারী সুদীপ দাশ ও উপজেলা টেকনিশিয়ান আমীর হোসেন বাদলকে দিয়ে সকল কাগজপত্র তৈরী করেছিলেন। তিনি বদলী হয়ে যাবার সময় তাদের কাছেই সকল কাগজপত্র রেখে গেছেন।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা টেকনিশিয়ান আমীর হোসেন বাদল বলেন- আমাদের কাছে যা কাগজপত্র ছিল তার সবকিছু আমরা ডিসি অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি। বর্তমানের এর চেয়ে বেশি কিছু আমাদের জানা নেই।

বর্তমানে নিযুক্ত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মীর মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নি। তবে মূল তত্ত্বাবধায়ক মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ তোফায়েল ইসলাম বলেন- বিষয়টি অনেক আগের। এ ব্যাপারে অফিসে ফাইলপত্র না দেখে কিছু বলা যাবে না। তাছাড়া তিনি বাইরে ব্যস্থ আছেন বলে জানান তিনি।

শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন- বিজিবি হামলায় শহরের শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য আমরা কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। এ ব্যাপারে আমাদের যা যা করার দরকার অবিলম্বে আমাদের কর্মসূচী হতে নেবো।

পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান বলেন- আমাদের মোট ৩৭ টি কার লাইটেস, ৭০ টি সিএনজি এবং ছোট-বড় আরো ৬০ টি ট্রাক ও ৫ টি মিনিবাস ভাংচুর করা হয়েছে। যার প্রতিটি মেরামত করতে আনুমানিক মূল্য লাগবে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা লেগেছে। এক বছর হয়ে গেছে আমরা কোন ক্ষতিপূরণ পাইনি। আর অপেক্ষা করা যাবে না। ক্ষতিপূরণ না পেলে আমরা আবারও সড়ক অবরোধ করবো।

উল্লেখ্য, ৫ জানুয়ারি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিজিবি’র সদস্যদের কর্তৃক শ্রীমঙ্গলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যানবাহনসহ পথচারীদের উপরে অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে যায়। এতে ৪ জন গুলিবিদ্ধ, শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যানবাহনসহ অর্ধশত মানুষকে পিঠিয়ে আহত করেছে বিজিবি সদস্যরা।

এদিকে বিজিবি’র হামলার ঘটনায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য ঘটনার সময় ছবি তুলতে গেলে বিজিবি সদস্যরা সাংবাদিকদের লাঠিপেটা করে ক্যামেরা লুটে নেওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সকল ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবী জানিয়েছেন শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এম. ইদ্রিস আলী।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”