স্মৃতিতে অম্লান বিপ্লবী শশাংক শেখর ঘোষ

ডিসেম্বর ৮, ২০১৮, ২:৫২ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ৩৬ বার পঠিত

সুভাষ চন্দ্র ঘোষ॥  অবিভক্ত বাংলায় তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যেসব দেশপ্রেমিক বিপ্লবী  ও স্বদেশী কিংবদন্তি হয়ে আছেন তাঁদেরই একজন বিপ্লবী শশাংক শেখর ঘোষ। মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলাধীন ০৩নং মুন্সিবাজার ইউনিয়নের খলাগ্রামে সম্ভ্রান্ত ঘোষ পরিবারে ১৯১৪ সালে তার জন্ম হয়। পিতা ডাঃ সরোজা কুমার ঘোষ ও মাতা শান্তিলতা ঘোষের দ্বিতীয় সন্তান শশাংক। পারিবারিক ঐতিহ্যে বেড়ে ওঠা শশাংক ছোটবেলা থেকেই ছিলেন স্বাধীনচেতা ও সৃজনশীল মনের অধিকারী। যতদূর জানা যায়, স্কুল জীবন থেকেই তিনি পরাধীন দেশের স্বাধীনতা ও মানুষের মুক্তির কথা ভাবতেন। ১৯৩১ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার বছর থেকেই পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গোপন পাঠে মনোনিবেশ করেন তখনকার অগ্রজ বিপ-বীদের লিখা বিভিন্ন বই ও স্বদেশী প্রচারপত্রে। অভিভাকদের বারণ স্বত্ত্বেও দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য তখন থেকেই বিপ¬বী ধ্যান-ধারণায় মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেন। জাত্যাভিমানতা ও বৈষয়িক উন্নতির ধারণা ছেড়ে ঋদ্ধ হন মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদী মননের প্রাতিস্বিকতায়। ক্রমশঃ সমাজের অবহেলিত মানুষের সহযোগী হয়ে তার দৃশ্যমান কর্মোদ্দীপনা।

১৯৩৬ সালে আসামের ডিব্রিগড় মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় ঘনিষ্ঠ হন তৎকালীন স্থানীয় বিপ¬বী নেতৃবৃন্দের সাথে। নাম লিখান ব্রিটিশ বিরোধী গোপন বিপ¬বী সংগঠন ‘তরুণ সংঘে’। লেখাপড়ার ফাঁকে সেখানে চলতে থাকে শারীরিক ব্যায়াম ও বিভিন্ন বিপ¬বী কার্যানুশীলন। রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি তাঁর এখান থেকেই। ‘লড়েঙ্গে আওর মারেঙ্গে’ এ দীক্ষায় চলে বিভিন্ন এসাইন্মেন্ট। নজর পড়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের। কিছুদিনের মধ্যেই ব্রিটিশ বিরোধী কার্যক্রমে অভিযোগের ভিত্তিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ফোর্স টি.সি দিয়ে বের করে দেয়। ডাক্তারি পড়া আর এগোয়নি। কিন্তু বিপ¬বী মন্ত্রে দীক্ষিত দ্রোহের প্রতীক শশাংকের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে ভাটা পড়েনি। অল্পকিছুদিনের মধ্যেই নিজেকে যুক্ত করেন তৎকালীন ভারতীয় কংগ্রেস দলে। আদর্শিক রাজনীতি ও দেশপ্রেমের কর্মস্পৃহা দেখে তখনকার অনেকেই তাকে কাছে টেনে নেয়। তন্মধ্যে, কুলাউড়ার ললিত কর, নিকুঞ্জ চৌধুরী, রবি ভট্টাচার্য্য, রামতনু ভট্টাচার্য্য প্রমুখ স্বদেশী নেতৃবৃন্দের নাম উলে¬খযোগ্য।

১৯৪২ সালের দিকে এক সময় তিনি গান্ধীজির ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলনেও নিজেকে যুক্ত করেন। বিভিন্ন ছদ্মনামে গোপনে স্বদেশী কর্মপরিকল্পনায় অংশ নিতেন। এরই ধারাবাহিকতায় আবারও ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়ে জেলে যেতে হয়। সে সময় ১ বছর কারাদন্ড ভোগ করেন। জেল থেকে বের হয়ে দৃঢ়চেতা শশাংক তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৪৪ সালে ‘নানকার’ আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করেন এবং কৃষকদের দাবী দাওয়া আদায়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন।

পরবর্তীতে ১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি নেতৃস্থানীয় কিছু কমিউনিস্ট বিপ¬বীদের সাথে তার পরিচয় ঘটে। তাদেরই অনুপ্রেরণা ও উপদেশে আত্মস্থ করেন মুক্তির পথ সমাজতন্ত্রকে। মার্কসবাদী সমাজতন্ত্রের দীক্ষিত হয়ে তিনি শ্রেণী সংগ্রাম ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এক নতুন লড়াইয়ে নিজেকে উৎসর্গ করেন। নিজ গ্রামে গড়ে তোলেন ‘গণশ্রী সমিতি’। সামাজিক উন্নয়ন বিশেষ করে তরুণদের স্বদেশী চেতনায় এ সংগঠনটি এলাকায় তৎকালে বেশ সুনাম অর্জন করেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হওয়ার আগ পর্যন্ত কিছুদিন তিনি তৎকালীন প্রথিতযশা কমিউনিস্ট নেতা ব্যারিস্টার জ্যোতি ভূষণ রায় (পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী) এর সাহচর্যে কাজ করেন ‘আসাম বেঙ্গল রেল শ্রমিক ইউনিয়নে’।

উলে¬খ্য, ৪৭’এর পর যখন অনেক স্বদেশী ও বিপ¬বী নেতা এ দেশ ত্যাগ করে ভারত চলে গিয়েছিলেন শশাংক তখন জন্মভূমির টানে এখানেই রয়ে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় পাক- ঔপনিবেশিক শাসনের এক পর্যায়ে গরীব কৃষকদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাশের দাবীতে স্থানীয় কৃষকদের সংগঠিত করেন। ১৯৫০ সালে তখনকার বহুল আলেচিত ‘ভুখা মিছিল’ এ স্খানীয় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন। সে সময় পাকিস্তানি শাসকদের রোষানলেও পড়তে হয়েছিল। তথাপি প্রতিকূল পরিবেশে তিনি ছিলেন লক্ষ্যে অবিচল। ১৯৫৬ সালে মৌলভীবাজার মহকুমা আওয়ামীলীগের ফুড কনফারেন্সে অতিথি বক্তা হিসেবে নিজের লিখা দীর্ঘ প্রবন্ধ পাঠ করে সবার প্রশংসা অর্জন করে ছিলেন।  সভার সভাপতি ছিলেন আলী সবদর খান (রাজাসাহেব)। যতদূর জানা যায়, তার লিখা বিষয়গুলো নিয়ে ঢাকার তৎকালীন আওয়ামী কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দগণ বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি তিনি শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চায়ও ছিলেন ঋদ্ধ। মার্কস-লেনিন ছাড়াও রবীন্দ্র, নজরুল, সুকান্ত, লালন প্রমুখের বই পড়া ছিল তার নিয়মিত পাঠ্যাভাসের অংশ। দৈনিক সংবাদপত্র পাঠ, রেডিও খবর শোনা, সৃজনশীল সাময়িকী ও ম্যাগাজিন পাঠ ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। অপরদিকে নিয়মিত ডায়েরী লিখা ছিল তাঁর হোম ওয়ার্কের অন্যতম অনুসঙ্গ। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কয়েক মাস আগে কিছুদিনের জন্য পাকিস্তানি শাসক তাঁকে বাড়িতে নজরবন্দি করে রাখে। তখন রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের তাঁর বাড়ীতে যাতায়াতের উপর ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জনমত সংগ্রহ ও স্বাধীনতার স্বপক্ষে তাঁর স্থানীয় অবদান ছিল সর্ববিদিত। স্বাধীনতা বিরোধী শান্তি কমিটি ও স্থানীয় রাজাকারদের পাঠানো তালিকা অনুযায়ী পাকিস্তানি সেনাদের এলাকায় টপ হিট লিস্টেড ছিলেন শশাঙ্ক শেখর ঘোষ ও তাঁর ভাই ডাঃ শরদিন্দু ঘোষ। ভাগ্যক্রমে এলাকার স্বাধীনতাকামী সহযোগিদের সহায়তায় তখন তাঁরা বেঁচে গেলেও গ্রামের ১৮ জন লোক শহীদ হন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ দিককার কথা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১লা মে তিনি সিলেট জেলা চা বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নিযুক্ত হন এবং সম্পাদক ছিলেন অপূর্ব কান্তি ধর। ঐ বছর ডিসেম্বরে শারিরীক অসুস্থতা হেতু উন্নত চিকিৎসার্থে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি ও বঙ্গবন্ধু সরকারের সহযোগিতায় তাঁকে বার্লিন (পূর্ব জার্মান) পাঠানো হয়। কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে ফিরে এসে আবারও এলাকায় মেহনতী মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের  সংগ্রামে বাম প্রগতিশীল রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭৩ সালে নিজ এলাকায় সহকর্মীদের সংগঠিত করে ২ দিন ব্যাপী ‘সিলেট জেলা কৃষক সম্মেলন’-এর মূল সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উক্ত সম্মেলনে কেন্দ্রীয় অতিথি হিসেবে কমিউনিস্ট নেতা মণি সিং, বারীন দত্ত, হেনা দাশ, তারা মিয়া, শান্তি দত্ত প্রমুখ নেতৃবৃন্দ এসেছিলেন। স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন মোঃ আব্দুল জব্বার চৌধুরী (মায়া মিয়া), আব্দুল মালিক, তবারক হোসেন, লজু ভাই, অপূর্ব কান্তি ধর, সৈয়দ আবু জাফর চৌধুরী, আতাউর রহমান চৌধুরী, পান্না লাল সোম প্রমুখ। জনশ্রুতি আছে, এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের এ যাবৎকালের স্থানীয় এলাকায় সর্ববৃহৎ ও সুপরিকল্পিত এক রাজনৈতিক সমাবেশ।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে শশাঙ্ক কখনই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। জীবদ্দশায় তিনি সবসময়ই বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক সমাজ ও মেহনতী মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতেন। ১৯৭৫ সালের কুচক্রি ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী কর্তৃক বঙ্গবন্ধু স্বপরিবার হত্যা, জাতীয় ৪ নেতা হত্যা এবং রাজনীতির দৃশ্যমান দ্বান্দ্বিক বিভক্তি তাঁর গভীর মন কষ্টের কারণ ছিল। সদালাপী, অকৃতদার এবং প্রচার বিমুখ এ রাজনীতিবিদ সর্বোপরি সবার কাছেই ছিলেন প্রিয় ‘শশাদা’ হিসেবে পরিচিত। জেলা তথ্য বাতায়নে প্রখ্যাত ব্যক্তি তালিকায় অন্যান্য কীর্তিমানদের সাথে তাঁর নাম যুক্ত আছে। ১৯৮৯ সালে ৯ অক্টোবর বার্ধক্য জনিত কারণে এ দেশ প্রেমিক রাজনীতিবিদের জীবনাবসান ঘটে। সম্প্রতি তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ সৃজনশীল রাজনীতিবিদদের নিয়ে জেলায় ‘শশাঙ্ক শেখর ঘোষ স্মৃতি সংসদ’ মৌলভীবাজার নামে একটি সমাজ সেবা মূলক সংগঠন আত্মপ্রকাশ করেছে। তিনি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। তবুও তাঁর আদর্শিক রাজনীতি ও দেশপ্রেম চির অ¤¬ান হয়ে আমাদের পথ দেখাবে অনন্তকাল, এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের!   লেখকঃ শিক্ষক ও লেখক॥

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”