স্মৃতিতে প্রকৃতির বরপুত্র দ্বিজেন্দ্র শর্মা

সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৭, ৭:১৭ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ১৮ বার পঠিত

বিকুল চক্রবর্ত্তী॥ প্রকৃতি পুত্র দ্বিজেন্দ্র শর্মার মুল প্রেরণা ছিলো দেশের সর্ব বৃহত জলপ্রপাত মাধবকুন্ডের উৎস পাতারিয়া পাহাড়। তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনে পৃথিবীর বহু প্রকৃতাঞ্চলে পরিভ্রমন ও সময় কাটালেও তাঁর  মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত হৃদয়ে দোলা দিতো শৈসব স্মৃতির ঘন বনাঞ্চল আবৃত প্রকৃত প্রকৃতাঞ্চল মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পাতারিয়া। যেখান থেকে সৃষ্টি মাধবকুন্ড জল প্রপাত। যার একটু ছোয়া নিতে প্রতিদিন সেখানে ছুঠে যান হাজার হাজার প্রকৃতি প্রেমী ও ভ্রমন পিপাসু। প্রকৃতির উপহার এই খনজন্মা পুরুষ দ্বিজেন্দ্র শর্মার জন্মভূমি এবং পৃত্রালয় মৌলভীবাজারের বড়লেখায় হলেও মৌলভীবাজারের নতুন প্রজন্মের অনেকই তা জানতেন না। তবে লেখা লেখি এবং মিডিয়ার বদৌলতে দ্বিজেন্দ্র শর্মা সকলের  কাছে পরিচিত ছিলেন।

 বছর খানেক আগে  মৌলভীবাজারের অতিপরিচিত বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী এডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিবের বাসায় যাই। উদ্দেশ্য তার বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণীপ্রেম বিষয়ে জানা। প্রসঙ্গক্রমে তার এ কাজের প্রেরণার উত্তরে উঠে আসে বিশ্বের খ্যাতনামা উদ্ভিদ বিজ্ঞানী দ্বিজেন্দ্র শর্মার নাম। কৌতুহলী হলাম। দ্বিজেন্দ্র শর্মা যাঁকে দেখেছি টেলিভিশনের পর্দায়। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে একুশে পদক নিতে। এ ছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন অনুষ্টানে, আবার পত্রিকার উপ-সম্পাদকীয় কলামে। সেই দ্বিজেন্দ্র শর্মা এডভোকেট মুজিবুর রহমানের গুরু। কিভাবে ? এ প্রশ্নের উত্তরে উঠে আসে দ্বিজেন্দ্র শর্মার বাড়ি মৌলভীবাজারে।

 নিজেকে অনেকটা ব্যর্থ এবং সংকীর্ণ কুটোরে অবস্থানকারী হিসেবেই মনে হচ্ছিল। এ সময় তিনি জানালেন, প্রকৃতির এই বরপুত্র দ্বিজেন্দ্র শর্মা বর্তমানে বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত। ঢাকায় নিজ বাসায় অসুস্থ। এ সময় আরেক প্রশ্নে  এডভোকেট মুজিবুর রহমান জানালেন, “সময় থাকলে চলো ঢাকায় দেখে আসি। আর বৃক্ষ সংরক্ষনে তুমি প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার পেয়েছো।  সম্পুন্ন বৃক্ষমননের এই মানুষটির সাথে তোমার পরিচয় থাকবে না তা কি হয়।” কাল বিলম্ব না করেই আমি দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করি। তিনিও তারিখ নিধারিত করে দিলেন ৪ আগষ্ট ২০১৬ ইং। সকাল বেলা ঢাকায় পৌছালাম। এড. মুজিবুর রহমান দ্বিজেন্দ্র শর্মার একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে বললেন, অনেক কষ্টে যোগার করেছেন। ফোন দিয়ে যেন বাসার ঠিকানা নেই। তবে তিনি অসুস্থ অন্য কেউ ধরবে বলেও জানান। দুপুরের দিকে ফোন করি, ওপান্থ থেকে বেশ সতেজ কন্ঠে উত্তর আসে কে। আমার পরিচয় দেই এবং দ্বিজেন্দ্র শর্মার সাথে দেখা করতে চাই। দ্বিজেন স্যার বাসায় আছেন কিনা জানতে চাই। উত্তর পাই বাসায় আছেন, তবে বিকেল ৫টার পরে গেলে ভালো হয়। বিকেলে ৪ টায়ই আমরা রওয়ানা হই। আমি এড. মুজিবুর রহমান মুজিব ও আমাদের সাথে আরও এক প্রকৃতি প্রেমী সমাজ হৈতষী শিক্ষানুরাগী শ্রীমঙ্গলের পাখির অভয়াশ্রমের প্রতিষ্টাতা মাষ্টার গোলাম মোস্তফা রাজা। সিদ্ধেশরীর ৪২ খন্দকার গল্লির ক্রীস্টার গার্ডেনে ৫টার দিকে পৌছাতেই গেইটম্যান উপরে ফোন দিলে দ্বিজেন স্যারের একজন ব্যাক্তিগত সহকারী নিচে এসে আমাদের নিয়ে যান। লিফটের আটে। দরজা খোলেন দিজেন স্যার নিজেই। শ্রদ্ধা এবং ¯েœহ ভালাবাসাপূর্ণ কৌশল বিনিময় হলো চার জনের। শ্রদ্ধেয় এড.মুজিবুর রহমান আমাদের দুজনের পরিচয় দিলেন। তার পর এই গুনি ব্যাক্তির সানিধ্যে প্রায় ৩ ঘন্টা। বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা। যে আলোচনায় উঠে আসে দ্বিজেন স্যারের শেকরের কথা। সেই মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাতারিয়া পাহাড়ের কথা। দৃঢ় কন্ঠে তিনি জানান, তার উদ্ভিদ বিজ্ঞানী হয়ে উঠার পেছনে পাতারিয়ার প্রকৃতিই মুল কাজ করেছে। শৈসবে ঘন গাছগাছালির পাতারিয়া তাকে আঁকড়ে ধরেছিলো। তবে এ সময় আরো একাধিক বিষয়ও উঠে আসে। বিশেষ করে তার পিতার তৈরী গাছগাছালীর ঔষদ ও বহু মানুষের ব্যাধি নিরাময়ও তার মনে দাগ কাটে। কথার ফাঁকে ভেতর থেকে গরম গরম চা নান্তা আসে। চা, সিঙ্গারা ও ভেজিটেবল রুল। গল্পের ফাঁকে  নাস্তা নিতে আমাদের বিলম্ব হচ্ছিল। এরই মধ্যে দিজেন স্যার বললেন এগুলো ঘরের তৈরী। আমাদের জন্য এখনই করা হয়েছে। গরম গরম সিঙ্গারা সবজী রুল খেয়ে খেয়ে কথা বলি। কথার ফাঁকে তিনি জোড় দিয়ে যে কথাগুলো বললেন, তার সারংশ হলো আমরা প্রকৃতিকে ধ্বংস করছি প্রকৃতি আমাদের ধ্বংস করে দিবে। তিনি বলেন, প্রকৃতি মানুষ সৃষ্টি করতে পারেনা। প্রকৃতিই প্রকৃতি সৃষ্টি করবে। তবে তাকে তার মতো থাকতে দিতে হবে। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন, প্রবাস জীবন এবং ঢাকায় অবসর জীবন কিন্তু ভুলেন নি তার শৈসব স্মৃতি পাতারিয়াকে। যখনই সময় পেয়েছেন কখনও একা কখনও সহধর্মীনীকে নিয়ে ছুটে এসেছেন মাধবকুন্ডের পাদদেশে । একান্তে বসে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। সে সময় কানিক্ষন কথা হয় দ্বিজেন স্যারে জীবনের আরও এক অংশ তার সহধর্মীনীর সাথে। তিনি জানান, অসুস্থ তবুও বাসায় থাকতে চাননা। গাছগাছালি যেন তাকে টানে। বিয়ের পর থেকে একাধিকবার তার সাথে বিভিন্ন গার্ডেন এবং গাছগাছালি বেষ্টিত এলাকায় সঙ্গী ছিলেন। তার মতে যখনই তিনি এ সব জায়গায় যেতেন প্রায় সময়ই তিনি যেন ( দ্বিজেন স্যার) আনমনা হয়ে যেতেন। অদৃশ্য কেউ যেন তার সাথে কথা বলছে। তাও গভীর মনোযোগে। শুধু দিনে নয় প্রকৃতির কাছে রাতেও বসে থাকতেন তিনি। মাঝে মাঝে তার কাছে মনে হতো তিনি যেন ( দ্বিজেন স্যার) প্রকৃতির কোন অংশ। তা না হলে তিনি কেন হঠাৎ এভাবে আনমনা হবেন। আর শ্রদ্ধেয়া দেবী চক্রবর্ত্তীর এই কথার সাথে মিল খুঁজে পাই তাঁকে নিয়ে লেখা তাঁর কাছের মানুষদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে। তাদের মতে যখনই তাঁকে নিয়ে তারা বেড়তে গিয়েছেন নদীর পাড়ে কিংবা, পার্কে বা কোন গ্রামে হঠাৎ দেখা গেছে দ্বিজেন স্যার তাদের পাশে নেই। তিনি নদীর ঢালে কিংবা লতাপাতায় জড়ানো সবুজ অংশে কি যেন খুঁজছেন। দিজেন স্যারকে জানতে গিয়ে দেখতে পাই দ্বিজেন স্যারের জ্ঞান ও কর্ম বিশাল। সাগর সম। যার কোন কূল কিনারা নেই।  অন্যদিকে দেখতে পাই তাঁর কর্মের ও ত্যাগের মুল্যায়নও হয়েছে। পেয়েছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক ২০১৫। পেয়েছেন বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার ১৯৮৭। বাংলা একাডেমী ফেলো, চট্টগ্রাম বিজ্ঞান পরিষদের কুদরাত-এ-খুদা স্বর্ণ পদক ১৯৮৬ ইং, শিশু একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার ২০০৮,অতিশ দিপংকর স্বর্ণপদক ২০০৯, প্রথম আলো বর্ষ সেরা গ্রন্থ পুরস্কার ২০০৭, চ্যানেল আই প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন পুরস্কার ২০১১, নুরুল কাদের শিশু সাহিত্য পুরস্কার ২০০০, জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মাননা ও রবীন্দ্র পদক ২০১৫, এছাড়াও ফরিদপুর নিসর্গ সংসদ কর্তৃক পেয়েছেন বৃক্ষাচার্য উপাধিসহ অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার।

দীর্ঘ জীবনে লিখেছেন অসংখ্য মুল্যবান বই। যা জাতীর সম্পদ। একই সাথে বিশ্বের খ্যাতনামা লেখকদের অসংখ্য বই অনুবাদও করেছেন। তার একাধিক বই দুইবার প্রকাশিত হয়েছে। তার বইএর উল্লেখযোগ্য হলো-শ্যামলী নিসর্গ (১৯৮০ ও ১৯৯৭ বাংলা একাডেমী এবং ২০১৫ কথা প্রকাশ) সপুস্পক উদ্ভিদের শ্রেণী বিন্যাস এটিও প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালে বাংলা একাডেমী থেকে।‘ ফুলগুলো যেন কথা ’এটিও প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ ও ২০০৪ সনে বাংলা একাডেমী থেকে। এ ছাগাও পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হয়, মম দু:খের সাধন, গহন কোন বনের ধারে, চার্লস ডারউইন ও প্রজাপতির উৎপত্তি, সমাজতন্ত্রে বসবাস, গাছের কথা ফুলের কথা, সতীর্থ বলয়ে ডারউইন: বিগল যাত্রীর ভ্রমন কথা, নিসর্গ- নির্মান ও নান্দনিক ভাবনা, জীবনের শেষ নেই, বাংলার বৃক্ষ, বিজ্ঞান ও শিক্ষা: দায়বদ্ধতার নিরিখ, হিমালয়ের উদ্ভিদ রাজ্যে ডালটন হুকার, এমি নামের দুরুন্ত মেয়েটি, কুরচি তোমার লাগি, আমার একাত্তর ও অনান্য, প্রকৃতিমঙ্গল, বৃক্ষ ও বালিকার গল্প, প্রকৃতি সমগ্র ১,২,৩, নির্বাচিত প্রবন্ধ, চার্লস ডারউইন এর দ্বিশতজন্মবার্ষিকির শ্রদ্ধার্ঘ ও গাছ। একিসাথে তিনি প্রগতি প্রকাশনে চাকুরী করার সময় ১৮ বছরে অর্ধশতাধিক বিখ্যাত বই ও খ্যাত নামা লেখকদের সম্পাদিত সংকলন বাংলার মানুষের জন্য তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন।

এই খ্যাতনামা বিজ্ঞানীর ১৯২৯ সনের ২ শে মে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে আরেক প্রকৃতি ভাবুক চন্দ্রকান্ত শর্মা ও মগ্নময়ী দেবীর ঘরে জন্মগ্রহন করেন।

তিনি বড়লেখার কাঁটালতলা শিমুলিয়া আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাইমারী শেষ করে, পিসি হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত এবং নবম,দশম ও এসএসসি ভারতের করিমগঞ্জ পাবলিক স্কুল থেকে।(বিজ্ঞান ১৯৪৭) উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন আগরতলা মহারাজ বীর বিক্রম কলেজ থেকে( জীব বিজ্ঞান ১৯৪৯), ¯œাতক করেন কলকাতা সিটি কলেজ থেকে ( উদ্ভিদ বিজ্ঞান ১৯৫২) ও ১৯৫৮ সনে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে ¯œাতক উত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন।

লেখা পড়া শেষে নিজেকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত করেন। তিনি প্রথমে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সন পর্যন্ত বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে জীব-বিদ্যার ডেমোনেস্টেটর এর দ্বায়িত পালন করেন এবং ৬২ সাল পর্যন্ত অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ৬২ থেকে ৭৪ সাল পর্যন্ত নটর ডেম কলেজে অধ্যাপনা করেন। কিছু দিন করে কায়েদে আজম কলেজ, সেন্টাল কলেজ, উইমেন্স কলেজ ও বাংলা কলেজেও অধ্যাপনা করেন। এর পর প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদক হিসেবে চলেযান রাশিয়ার মস্কোতে। কাজ করেন টানা ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। এর পর ২০০০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত কাজ করেন অনুবাদক ও সম্পাদক হিসেবে বাংলাপিডিয়া ও এশিয়াটিক সোসাইটিতে। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাপিডিয়া ও এশিয়াটিক সোসাইটিতে  উদ্ভিদ ও প্রাণী জনকোষ প্রকল্পের সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করেন।

শেষ বয়েসেও তিনি সর্বাধিক সময় কাটাতেন বই পড়ে। সেদিন তাঁর শেষকথা ছিলো “দেশের আহরন নিষিদ্ধ বনে মানুষের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে।”

তাঁকে আমরা মৌলভীবাজার জেলাবাসীর পক্ষ থেকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়ার প্রস্তাব দেই। শাররীক অবস্থার কারনে মত দেননি। তাবে তাঁর সহধর্মীনী দেবী চক্রবর্তী বলেছিলেন শরীরের অবস্থা ভালো হলে একদিনের জন্য আসবেন।

 দীর্ঘ আলোচনায় তাঁকে জানার অতৃপ্তি নিয়েই ফিরে আসি। আর মনে মনে তাঁকে একবার তার জন্মভুমি মৌলভীবাজারে নিয়ে এসে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়েদেয়ার পরিকল্পনা করি। কিন্তু বিধাতা আমাদের সে সুযোগ দেননি। শুক্রবার ভোর রাতে তিনি ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে পরলোকে গমণ করেন। তবে আমার বিশ্বাস মৌলভীবাজারের নতুন প্রজন্ম তাঁর প্রকৃতি প্রেম ও সাহিত্য কর্মের মাধ্যমে তাঁকে জানবে এবং সারা জীবন মনে রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন