বেহাল দশায় হাকালুকি হাওরের গরু মহিষের “বাতান”

জানুয়ারী ১৩, ২০১৯, ৮:০০ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ৮১ বার পঠিত

ইমাদ উদ দীন॥ শুষ্ক মৌসুমে হাওরের ঐতিহ্য ‘বাতান’।  হাকালুকি হাওরের বিশাল এলাকায় গড়ে উঠে একাধীক বাতান বা রাখালি ব্যবসা। ওই সময়  মাছ আর পরিযায়ী পাখির সাথে দেখা মেলে গরু মহিষেরও। একদল লোক হাওর জুড়ে চরান হাজার হাজার গরু ও মহিষের দল। সবুজ ঘাসের রাজ্যে তাদের নিরাপদ খাদ্য ও বাসস্থান। এমন দৃশ্য যেন গ্রাম বাংলার এক অন্যরকম রুপ। খাদ্য সংকটের এসময়টাতে গরু মহিষ ওই সকল বাতানে দিয়ে অনেকটা নিরাপদ হন মালিকরা। নানা সংকট ও সমস্যায় এই রেওয়াজি ঐতিহ্য এখনো ধরে রাখার প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রেখেছেন হাওর পাড়ের বাসিন্দারা। কিন্তু নানা কারনে দূর্দশায় পড়েছে হাওরের চির চেনা এই ঐতিহ্য। এমনটি অভিযোগ স্থানীয় বাতান আয়োজকদের। জানাগেল রাখালির টাকা,দুধ আর গোবর সংগ্রহে জমে উঠে বাতান ব্যবসা। হাওরের বুকে শুষ্ক মৌসুমের উৎকৃষ্ট সেবামূলক ব্যবসা এটি। পুঁজিহীন কায়িক পরিশ্রমের অনেকটাই লাভজনক এই ব্যবসার নামই ‘বাতান’। শুষ্ক মৌসুমে হাওর অঞ্চলের এই বাতান বা রাখালি ব্যবসার সুনাম কিংবা কদর রয়েছে গো-মহিষের মালিকদের কাছে। সংশ্লিষ্টরা জানালেন এখন পুরো হাকালুকি হাওরে ছোট বড় মিলে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক বাতান। যাতে আশ্রয় হয়েছে কয়েক হাজার দেশীয় প্রজাতির গরু ও মহিষের। দেশের বিখ্যাত হাকালুকি হাওরে এখন ঠাঁই নিয়েছে অতিথি পাখি আর গরু ও মহিষ। খাদ্য সংকটে থাকা এসকল ক্ষনস্থায়ী অতিথিরা জীবনের তাগিদে হাওরে ঠাঁই নেওয়ায় বেড়েছে হাওরের সুন্দর্য। একেক বাতানে জমায়েত গরু কিংবা মহিষ একশ কিংবা দু’শত মালিকের। হাওরের বুকে ঠাইঁ নিয়েছে  বিভিন্ন এলাকার নানা রং ও আকৃতির গরু কিংবা মহিষ। খাদ্য সংকট এলাকার এসকল গরু ও মহিষের ৪ থেকে ৫ মাস ওখানেই হয় নিরাপদ আশ্রয়। হাওরের সবুজ ঘাস খেয়েই তারা হ্র্ষ্ট পুষ্ট হবে। ৪শ‘ ৫শ‘ কিংবা তারো অধিক গরু কিংবা মহিষ বিশাল দলের দেখভাল করছেন ১০/১৫ জন লোক। কেউবা দুধ দোহন করেন কেউবা রাখালি করছেন আর কেউ কেউ পানি খাওয়াচ্ছেন বা তাদের গোসল দিচ্ছেন । হঠাৎ একসাথে এতসব গরু মহিষ অবাক করে যে কাউকে। প্রশ্নও জাগে এতগুলো গরু মহিষ দেখভাল করেন কি ভাবে। আর কার দেওয়া কোন গরু কিংবা মহিষ কোনটি তা চিনেন কি ভাবে । সব কৌতুহল নিবারণ হয় পাশ থেকে তাদের কাজ দেখলে। এ কাজে অভ্যস্থ মানুষ গুলো শৃঙ্খলিতভাবে নিজ নিজ দ্বায়িত্ব পালনে ব্যাস্ত রাত দিন। বিস্তৃত হাকালুকি হাওর এখন শুধু সবুজ ঘাসের মাঠে গরু আর মহিষের অবাধ বিচরন। হাওর জুড়ে ২৩৮ বিলের অনেক বিলেই এখন নেই পানি। হাওরের মাঝখান অনেকটা মরুভূমির মত। বিলের পাড় গুলোতে সবুজ ঘাস জীবন বাচ্চাছে গরু মহিষদের। এখন ভর শুস্ক মৌসুম তাই হাওর ছাড়া অন্য এলাকাতে গুরু মহিষের খাদ্য সংকট। এমনিতে এসময়টায় হাল চাষ না থাকায় অনেকটা  কাজ ছাড়াই অলস সময় কাঠে চাষীদের  গরু মহিষের। একদিকে কাজ নেই অন্যদিকে  গো-মহিষের খাদ্য সংকট। সব মিলে গো-মহিষের খাদ্যের দু:সময় চলছে এখন। বর্ষা মৌসুম শুরু না হলে নতুন ঘাসও গজাবেনা। হাওর এলাকা ছাড়া অন্য (উজান) এলাকাতে পানি অভাবে আগের ঘাসগুলোও মরে গেছে। তাই এলাকার গো-মহিষের মালিকরা আগের জমিয়ে রাখা আউশ কিংবা আমন ধানের শুকনো খড়কুট খাইয়ে কোন রকম ওদের প্রাণ বাচাঁনোর চেষ্টা করেন। এমন খাদ্যহীনতায় আর এই দূর্যোগপূর্ণ সময় কাঠিয়ে উঠতে মালিকদের তাই বিকল্প চিন্তা। আর এনিয়ে চিন্তিত মালিকদের গো-মহিষের খাদ্যসংকট দূর করে তাদের বাচিঁয়ে রাখতে  হাওর এলাকায় খোলা হয়ে অভিনব এই রাখালি ব্যবসা।পন্থাটা অনেক পুরোনো হলেও এখনো নতুনের মত করে এ ঐতিহ্যকে বাচিঁয়ে রেখেছেন  স্থানীয় কিছু মানুষ । গতকাল হাকালুকি হাওরের নাগুয়া, হাওর খাল ও চৌকিয়া বিল এলাকায় কথা হয় বাতান মালিক কামলা মিয়া,সাইফ মিয়া,মন্তাজ উল্লাহ, নানু মিয়া,আনজিব মিয়া, ফারুক মিয়া সহ অনেকের সাথে। তারা জানালেন বাতান ব্যবসার আদ্যোপান্ত। তারা কয়েকজন মিলে আলাদা ভাবে  গরু ও মহিষের বাতান করেছেন। তারা ৫ জন  প্রায় সাড়ে ছয় শতাধীক গরু মহিষের দেখ ভাল করছেন। অগ্রাহায়ন ও পৌষ মাসে এসকল গরু মহিষের মালিকরা তাদের গরু মহিষ দেখভাল করা জন্য তাদের কাছে রেখে যান আর বৈশাখ মাসে  নিতে আসেন। তারা জানালেন টাকা পয়সার জন্য  নির্দিষ্ট কোন  নিয়ম না থাকলেও এটা অনেকটা আন্তরিকতা বিবেক থেকেই চলে। প্রতিটি গরু কিংবা মহিষ তাদের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় মালিকরা খুশি হয়ে  পাঁচ শ’ থেকে হাজার পনের শত টাকা  দিয়ে যান এ নিয়ে  নির্দিষ্ট করে চাওয়া পাওয়া নেই তাদের। আর দুধের গাভী (মহিষ কিংবা গরু) থাকলে মালিকরা টাকা দেনওনা আর তারাও চাননা। মূলত তাদের ব্যবসা হল প্রতিদিনের দুধ ও গোবর। একেকটি বাতান থেকে কয়েক শ’ লিটার দুধ পাওয়া য়ায় এদিয়েই তাদের বাতান ব্যবসার মূল আয়। দুধ আর গোবর বিক্রি করে  প্রতিদিনই নগদ আয় হয়। দুধের পাইকাররা তাদের বাতান থেকেই দুধ কিনে নেন। এছাড়া মালিকরা তাদের গরু মহিষ নেওয়ার সময় দিয়ে যান নগদ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিদিনের খরছ পরে বাতান শেষ হলে লাখ টাকার উপরে তাদের ভাগে ঠিকে। খাওয়া দাওয়া আর ঘুমানোর কষ্ট ছাড়া অন্য কোন সমস্যা না থাকলেও পানি সংকট প্রকট। গরু মহিষের গোসল আর পানি খাওয়াতে তাদের অনেক দূর্ভোগ পোহাতে হয়। যে সকল বিলে পানি আছে সে গুলো ইজারা নেওয়া। এসব  বিল থেকে পানি নিতে বাধা দেন ইজারাদাররা। যে সমস্যাটি কয়েক বছর আগে খুব কম ছিল এখন তা বড় সমস্যা হয়ে তাদের দূর্ভোগে ফেলেছে। গরু মহিষের নানা রোগবালাইয়ে হাওর এলাকায় ডাক্তার পাওয়া কষ্ঠকর। স্থানীয় প্রাণীসম্পদ বিভাগের লোকজনকে ডাকলেও তারা হাওর আসতে চাননা। রোগাক্রান্ত হয়ে অনেক গরু মহিষ মারা যায় সঠিক চিকিৎসার অভাবে। তাছাড়া নাব্যহ্রাসে এখন হাওরেরও বেহাল দশা। এখন নানা কারনে অস্থিত সংকটে হাকালুকি হাওর। তাই আগের মত নেই বাতান বা রাখালি ব্যবসা। আর এমন সংকটে পড়ে অনেকটাই কমে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির গরু মহিষের লালন পালন। তাদের দাবি এই হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সরকার উদ্যোগী হলে বাতান ব্যবসাসহ ঠিকবে সকল উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীর ঐতিহ্য।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”