রোহিঙ্গা সংকট ও মানবাধিকার রক্ষায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অধিকার পুনঃ প্রতিষ্ঠাই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৭, ৪:৪৬ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ৬ বার পঠিত

মোহাম্মদ আবু তাহের॥ মিয়ানমারের রোহিং এলাকায় যারা বসবাস করেন তারাই রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। রোহিঙ্গা শব্দের অর্থ নৌকার মানুষ। যারা সমুদ্রে নৌকার সাহায্যে মৎস্য আহরণ করে জীবিকা অর্জন করে দিনাতীপাত করেন। ইতিহাসবিদদের মতে আরবি শব্দ রহম থেকে রোহিঙ্গা শব্দের উদ্ভব। অষ্টম শতাব্দীতে আরবের বাণিজ্য জাহাজ রামব্রি দ¦ীপের তীরে এক সংঘর্ষের কারণে ভেঙ্গে পড়ে। তখন তারা বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে রহম, রহম, বলে দয়া প্রার্থনা করে। মহান আল্লাহ পাক তাদের বাঁচিয়ে দেন। তখন থেকেই তারা রোহিঙ্গা নামে পরিচিতি পায়। রাখাইন রাজ্যের জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী। বিভিন্ন তথ্যানুসারে বহুকাল আগে থেকেই রোহিঙ্গারা বসবাস করছে সে অঞ্চলটিতে। মিয়ানমার বিট্রিশ শাসন মুক্ত হয়েই রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার বিভিন্ন প্রক্রিয়া গ্রহন করতে থাকে। রোহিঙ্গারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ৯ (নয়) লাখ, সৌদি আরবে ০৪ (চার) লাখ, পাকিস্তানে ০২(দুই) লাখ এবং থাইল্যান্ডে ০১ (এক) লাখ। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির নৃশংস রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও নিপীড়ন পৃথিবীর সকল শান্তিপ্রিয় মানুষকে হতবাক করেছে। মানুষ হিসেবে তাদের কোন বেঁচে থাকার অধিকার নেই। নেই তাদের কোন মানবাধিকার। জাতিসংঘই বলেছে বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠির নাম রোহিঙ্গা। নির্যাতন নিপীড়ন বন্ধে জাতিসংঘের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। মিয়ানমার স্বীকার করুক বা না করুক রোহিঙ্গারা ঐতিহাসিক ভাবেই সে দেশের নাগরিক। বিশ্বের কোথাও যদি শান্তি বিঘিœত হয় মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার যদি না থাকে সেখানে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা মানুষের বসবাসের অধিকার ফিরিয়ে দেয়াই জাতিসংঘের দায়িত্ব ও কর্তব্য। বুদ্ধ রাখাইনদের টার্গেট হলো নিরস্ত্র রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নির্যাতনের মাধ্যমে নির্মূল করে দেওয়া। দেশ ত্যাগে বাধ্য করা। সেই লক্ষ্যে সরকার, সেনাবাহিনী অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতারিত করার জন্য রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা চালাচ্ছে মিয়ানমার সরকার। অং সান সূচি ও তার দল এন এল ডি লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেছে। বৌদ্ধ ধর্মের মূল নীতি হলো অহিংস হওয়া। হিংসা বিদ্ধেষ ভুলে গিয়ে মানবতার জয়গান গাওয়া। গৌতম বুদ্ধ তাঁর অনুসারিদের অহিংস হওয়ার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তিনি সর্বজীবে দয়া ও অহিংসা মন্ত্রের চর্চা করে গেছেন। মিয়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারিদের সম্পূর্ণ বিপরীত ভূমিকায় অবতীর্ন হতে দেখা যায়। এই বুদ্ধ ভিক্ষুরাই সূিচর রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল সমর্থক। সূচির ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সূচি শান্তিতে নোবিল পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু তিনি মুসলিম রোহিঙ্গাদের নির্য়াতনের বিষয়ে কথা বলছেন না। তার নোবেল পুরস্কার প্রতাহারের দাবী উঠেছে। পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবী ক্রমাগত জোরালো হচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ সূচির নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়ার পক্ষে। আন্তর্জাতিক শান্তি এবং ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় যারা কাজ করেন তাদের মধ্য থেকেই নোবেল পুরস্কার পেয়ে থাকেন। সূচির মতো যারা এই পুরস্কার পেয়েছেন তারা আজীবন এই মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করবেন পৃথিবীর মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই এটি প্রত্যাশা করবে। অং সান সূচির দীর্ঘ নীরবতা পুরস্কার প্রত্যাহার বা ফিরিয়ে নেয়ার দাবীকে গ্রহন যোগ্য করে তুলছে বলে মনে করি। যখন একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী তার নিজ দেশে তিনি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় শান্তি রক্ষায় ব্যর্থ হন নির্যাতনের কারণে সংখ্যালঘু দেশ ত্যাগে বাধ্য হয় তখন শান্তি রক্ষার স¦ার্থেই নোবেল শান্তি কমিটির উচিত শান্তি পুরস্কার জব্দ করা অথবা শান্তির স্বার্থেই নতুন ভাবে চিন্তা করা। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে কারও পুরস্কার এখনও প্রত্যাহার হয়নি যেমন সত্য, ঠিক তেমনি সত্য মিয়ানমারের মতো অন্য কোন দেশে সংখ্যালঘু মানুষও এ ধরনের অমানবিক নৃশংস রাষ্ট্রীয়ভাবে হত্যার ঘটনাও ঘটেনি। সকল ধর্মই বলে মানুষ হত্যা মহাপাপ। অথচ মিয়ানমারের বুদ্ধ নেতারা নীরব। তারা কেন মহামতি গৌতম বুদ্ধের অহিংস বাণীগুলো অনুসরণ করেন না, ধারন করেন না। সকল ধর্মের শিক্ষাই হলো বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও মানবতা। মানবাধিকারের মূল কথা হলো ব্যক্তির মানবসত্বা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় রোহিঙ্গারা কোন মানব তো নয়ই তারা যেন কোন প্রাণীই নয়। কারণ যারা সত্যিকারের মানব সন্তান তারা অন্য প্রাণীর প্রতিও মায়া মমতা দেখাবে। মানুষ হয়ে অন্য মানুষের বিপদাপদে সহমর্মিতা সাহায্য সহযোগিতা না করা মহাপাপ। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণার ১৩ ধারায় বলা হয়েছে প্রত্যেক রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে চলাচল ও বসতি স্থাপনের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে। ১৪ ধারায় বলা হয়েছে নির্যাতন এড়ানোর জন্য প্রতোকেরই অপর দেশ সমূহে আশ্রয় প্রার্থনা ও ভোগ করার অধিকার রয়েছে। ১৭ ধারায় বলা হয়েছে কাউকে তার সম্পত্তি থেকে খেয়াল খুশি মতো বঞ্চিত করা চলবে না। ২২ ধারায় বলা হয়েছে সমাজের সদস্য হিসেবে প্রত্যেকেরই সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। প্রত্যেকেই জাতীয় প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সংগঠন ও সম্পদ অনুসারে তার মর্যাদা ও অবাধে ব্যক্তিত্ব বিকাশে অপরিহার্য অর্থনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সমূহ আদায় করার জন্য স্বত্ববান। সদস্য রাষ্ট্রসমূহ যাতে মানুষের মানবাধিকার হরণ না করতে পারে সেজন্য জাতিসংঘ অঙ্গিকারবদ্ধ। মানবাধিকার এর বিষয়টি কোনো রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিষয় নয়।
রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অধিকার পুনঃ প্রতিষ্ঠাই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ। মানবাধিকার রক্ষার জন্যই বাংলাদেশের সম্পদ ও ভূমি সীমিত থাকা সত্ত্বেও লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে পৃথিবীতে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার রোহিঙ্গাদের সাথে সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করেছেন। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী রিয়াজুল হক বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নির্মম নির্যাতন পৃথিবীতে নজিরবিহীন নির্যাতনের ঘটনা। রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের নিজস্ব সমস্যা। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার চিন্তা করতে পারে বলে মনে করি। রোহিঙ্গারা শত শত বছর ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাস করছে। জন্মগত ভাবেই তারা সেখানকার নাগরিক। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন জেনারেল অং সান। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই অং সান ও তার মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের ব্রাশ ফায়ারে হত্যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করে নেয় সেনাবাহিনী। তখন থেকেই বার্মা চলে যায় সামরিক শাসনের অধীনে। পৃথিবীর অন্য কোন দেশ এত দীর্ঘ সময় সামরিক শাসনের অধীনে থাকার রেকর্ড নেই।
১৯৮২ সালে সামরিক সরকার মিয়ানমারের সংবিধান সংশোধন করে রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন মানুষে পরিণত করে। মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আজীবন আন্দোলন করে সু চি ক্ষমতায় এসেছেন, শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন। মিয়ানমারের কথিত গণতন্ত্রের নেত্রীকে মার্কিন সাংবাদিক অ্যালেন ক্লেমেন্টস ক্ষমতাহীনদের ক্ষমতার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। অ্যালেন ক্লেমেন্টস এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সূচী বলেছিলেন “আমরা এমন একটা বিশ্বে বসবাস করতে চাই যেখানে দেশগুলো মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে। আমার ভয় হলো আমরা যদি সহিংস পদ্ধতিতে গনতন্ত্র অর্জন করি তাহলে ভবিষ্যতে যে কোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এ আইডিয়া বা ধারণা থেকে আমরা কোনোভাবেই রেহাই পাবো না। এটা শুধু আমাদের শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তুলতে সাহায্য করে না, এটাও শেখায় যে, সহিংসতা কোনো সঠিক পথ নয়।” কিন্তু এখন সূ চি এত নিষ্ঠুর কেন? কেন তিনি এত অমানবিক, কেন এত নীরব ও নিস্তব্ধ। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী সূচির দেশ মিয়ানমারে যে নিষ্ঠুর অমানবিক নির্যাতন মানুষের উপর চালানো হচ্ছে এমন নির্যাতন আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগকেও হার মানায়। রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের কথা আসলেই মানুষ হিটলারের কথা বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করেছিল। মিয়ানমারের অমানবিক নিষ্ঠুর নির্যাতনের অবস্থা দেখে মনে হয় সূচি হিটলারের মতই নিষ্ঠুর। সূচি যদি প্রতিবাদী না হন, সংখ্যালঘু মানুষের উপর অত্যাচার বন্ধ না করেন তাহলে পৃথিবীর মানুষ হয়তো হিটলারের নাম ভুলতে শুরু করবে।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বাড়িতে ঢুকে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে। শিশুদেরকে হত্যা করেছে। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। মেয়েদের তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এমন অমানবিক আচরণ দেখা যায়নি। রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে তা বর্ণনাতীত। বাবা ভাইয়ের সামনে মা বোন স্ত্রীর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। বাবা মায়ের কোল থেকে শিশু কেড়ে নিয়ে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব দৃশ্য বর্ণনা করা যায় না। ফেসবুকে এসব নির্যাতনের দৃশ্য দেখে বিবেকবান মানুষ মাথা ঠিক রাখতে পারে না। মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক রোহিঙ্গার মর্মস্পর্শী চিঠি থেকে জানা যায়, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অবস্থা হলো- খাঁচার ভেতরে ক্ষুধার্ত বিড়ালের সামনে একটি অসহায় ইঁদুর। আমার সারা জীবন মানে জীবনের ২৪টি বছরই আমি এই উন্মুক্ত কারাগারে বাস করেছি। আপনারা যাকে বলছেন রাখাইন। আমার বাবা মায়ের মত আমিও মিয়ানমারে জন্মগ্রহণ করেছি। তবে আমার জন্মের আগেই আমার নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা নিশ্চিন্ন হয়ে যাচ্ছি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠীর পাশে না দাঁড়ায় তবে আমরা শেষ হয়ে যাব। সেক্ষেত্রে আপনারাও হবেন এই অপরাধের একটি অংশ। আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হলো পালিয়ে যাওয়া অথবা আমাদের কেউ উদ্ধার করবে এই আশায় থাকা।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে অংসান সূচি শান্তির প্রতীক না হয়ে অসহায় মানুষদের নির্যাতন নিপীড়নের প্রতীকই হয়ে থাকবেন বলে মনে হয। অংসান সূচি তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে বলেছেন রাখাইন রাজ্যে সর্ব সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই যদি হয়ে থাকে বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা কেন আশ্রয় নিল। এ ধরণের বক্তব্য কী পৃথিবীর বিবেকবান মানুষের সাথে উপহাস নয়? রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ, জাতিসংঘের কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান রোহিঙ্গারা সে দেশের নাগরিক স্বীকার করেন না। যদি তাই হয় একজন মন্ত্রী, দুই নারী সহ ১৭ জন বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্য ছিলেন কিভাবে? রোহিঙ্গাদের নির্যাতন বন্ধের জন্য ভারত ও চীনের এখনই এগিয়ে আসা দরকার। ভারত ও চীন এগিয়ে আসলে নিরীহ মানুষদের নির্যাতন ও হত্যা বন্ধ হতে সময় লাগবে না বলে মনে করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারের উথিয়ায় রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নারকীয় তান্ডবের বর্ণনা শুনে প্রধানমন্ত্রী অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। এমন নিষ্ঠুরতায় পাষাণ হৃদয়ের মানুষও কষ্ট পাবে এতে কোনো সন্দেহ নাই। রোহিঙ্গাদের জন্য কাঁদছে বিশ্ব মানবতা। রোহিঙ্গাদের কান্নায় কক্সবাজারের আকাশ, বাতাস ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে। সর্বস্ব হারিয়ে পালিয়ে এসে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে এ সমস্ত অসহায় মানুষ। সংবাদপত্রে দেখলাম দায়িত্ব পালনরত গণমাধ্যম কর্মীরাও কাঁদছেন তাদের দুঃখ দেখে। রোহিঙ্গারা কোথা থেকে এসেছে, কী তাদের ধর্ম, কী তাদের জাতীয়তা মানুষ এখন এ বিষয় নিয়ে চিন্তা করছে না। এখন বিবেচ্য বিষয় হলো সবার উপরে মানবিকতা। সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে কিছু নেই। অনাহারে অর্ধাহারে খোলা আকাশের নিচে বিনা চিকিৎসায় রোহিঙ্গারা যেন সভ্যতার অভিশপ্ত কীট হিসেবে দিনাতিপাত করছেন। বেঁচে থাকার খাবার এবং খাবারের জন্য হাহাকার- এ যেন কল্পনা করতেও কষ্ট হয়। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ এর দৈনিক বর্তমান পত্রিকার এক সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা গেল কক্সবাজারের উথিয়ায় রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পে দুই দিন ধরে অভুক্ত থাকা এক পরিবার এর একটি ভাতের প্যাকেটে আট জনের ক্ষুধা নিবারণ। কাঙ্খিত ভাতের প্যাকেট থেকে স্ত্রী সন্তানরা একটু একটু মুখে দিয়ে ক্ষনিকের জন্য যৎসামান্য ক্ষুধার যন্ত্রণা নিবারণ করলেও পরিবারের কর্তা রহিমুল্লা নিজে উপোসই রয়ে গেলেন। যাই হোক বাংলাদেশের অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন নিজ দেশে না ফেরা পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা অনুযায়ী দেশের সকল রাজনৈতিক দল, সকল সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সাধ্যানুযায়ী সকল মানুষ আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম অধিকার যাতে পায় সে ব্যাপারে আন্তরিক উদ্যোগ দরকার বলে মনে করি। যে কোনো বিষয়ে রাজনীতি করা গেলেও মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রশ্নে কোনো রাজনীতি চলে না। রোহিঙ্গাদের যাতে স্থায়ীভাবে আমাদের দেশে থাকতে না হয় সেজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।
গণমাধ্যম থেকে জানা যায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘুদের সহিংস নির্যাতনের মাধ্যমে বিতারিত করার পর দেশটির সরকার সেখানকার মংগদু শহরে স্পেশাল ইকোনমিক জোন গড়তে যাচ্ছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তেই প্রমাণ বহন করে যে, মিয়ানমার বর্তমান পৃথিবীর এক বর্বরতম দেশ। নরপশুর দেশ। পশুর যেমন কোনো বিবেক থাকে না তেমনি মিয়ানমারবাসীরও কোনো বিবেক নেই। মানবতাহীন ও বিবেকহীন এই দেশকে রূখতে হলে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ১৯৮২ সালের নাগরিক আইনকে সংশোধন করে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে। এটি না করে কফি আনান কমিশনের বাস্তবায়ন ঘোষণাও হাস্যকর হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়াই সংকট থেকে মুক্তিরএকমাত্রপথ।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন