ষোলই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস : স্মৃতিকথাঃ ইতিকথাঃ কতব্যাথা

ডিসেম্বর ৬, ২০১৭, ৮:০২ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ৯২ বার পঠিত

মুজিবুর রহমান মুজিব॥ মহান মুক্তিযুদ্ধ- বাংলা ও বাঙ্গালির হাজার বছরের সংগ্রামী ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায়। ঐতিহ্য মন্ডিত অধ্যায়। আমাদের প্রজন্মের চরম সৌভাগ্য ও পরম পাওয়া এই যে, একাত্তোর সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহন ও নেতৃত্ব দানের সুযোগ হয়েছিল। ১৯৬২ সালে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্টার লক্ষ্যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও তাত্বিক সিরাজুল আলম খাঁন গোপন সংঘটন-নিউক্লিয়াস-গঠন করেছিলেন। তাঁর ভক্ত ও সমর্থক ছিলাম। ষাটের দশকের শুরুতে ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে আমার হাতে খড়ি। ঐ দশকে প্রথমে মৌলভীবাজার কলেজ শাখা অতঃপর তৎকালীন মহকুমা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্ব্বাচিত হই। আন্দোলনে-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেই। দূঃসাহসী ছিলাম। শক্তিমান সংঘটক ও সুবক্তা হওয়ার কারনে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সুনজরে ছিলাম।

সত্তোর সালের সাধারন নির্ব্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রধান বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক উভয় পরিষদে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থীগন বিপুল ভোটে নিরংকুশ সংখ্যা গরিষ্টতা অর্জন করতঃ জয় লাভ করলেও পাক ফৌজি প্রেসিডেন্ট লেঃ জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খাঁন এবং পাকিস্তানী কায়েমী স্বার্থবাদী চক্র নির্ব্বাচিত জনপ্রতিনিধি তথা বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকে। মুজিব-এহিয়া-ভূট্টো-আলোচনার নামে সময় কর্তন করতঃ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য সমাবেশ করতে থাকে। বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিব আহুত শান্তিপূর্ন অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনে কোথাও কোথাও আন্দোলন রত বাঙ্গালি জনতার উপর গুলীবর্ষন করতে থাকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। এমতাবস্থায় একাত্তোরের মার্চ মাসে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হতে থাকে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কলাভবনে ডাকসুর ভি.পি আ.স.ম রব কর্তৃক কলা ভবনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন, পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতা শাহাজাহান সিরাজ কর্তৃক পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ সর্ব্বোপরি সাতই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষনে অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলন চুড়ান্ত আকার ধারন করে। বঙ্গঁবন্ধুর সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষন ইউনেস্ক কর্তৃক স্বীকৃতির মাধ্যমে বিশ^ সম্পদে পরিনত হয়েছে।

একাত্তোর সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে মাষ্টার্স ফাইনালের ছাত্র এবং হাজি মোহাম্মদ মহসিন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। তৎকালীন ইকবাল হল- বর্ত্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হলে একশত একষট্টি নম্বর রুমের আবাসিক ছাত্র ছিলেন অগ্রজ প্রতিম গিয়াস উদ্দিন মনির। তিনি ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সমাজ সেবা সম্পাদক ছিলেন। ইকবাল হলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের আবাস স্থল ছিল। সেহেতু ইকবাল হলে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। সেখান থেকেই দেশীয় রাজনীতির সর্বশেষ খবর পেতাম। মনির ভাই স্বাধীনতা উত্তর কালে বি.সি.এস প্রথম ব্যাচ-এ- যোগ দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপদ শেষে বৃটেনে বাংলাদেশের হাই কমিশনার ছিলেন। সরকারি চাকরিতে আমার উৎসাহ না থাকায় তিনি স্বয়ং আমাকে নিয়ে গিয়ে ঢাকাস্থ সিটি ল’ কলেজে এল. এল. বি. তে ভর্ত্তি করিয়ে দেন। আমারও সাংবাদিকতা ও আইন পেশায় উৎসাহ ছিল।

অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চুড়ান্ত আকার ধারন করলে দেশীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি চুড়ান্ত আকারে উত্তপ্ত হয়। যেকোন সময় যেকোন কিছু হয়ে যেতে পারে অবস্থা। নেতাদের নির্দেশে আমি কতেক দিক নির্দেশনা সহ ঢাকা ত্যাগ করে নিজ এলাকায় চলে আসি। ছাত্রলীগ নেতা হিসাবে স্থানীয়ভাবে আন্দোলন সংগ্রামে শরিক হই। সংঘটিত করি। নেতৃত্ব দেই।

তেইশে মার্চ উনিশশ’ একাত্তোর। সাত-চল্লিশ বৎসরের মাথায় এখনও স্মৃতিতে সমুজ্জল। ২৩শ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস জবঢ়ঁনষরপ উধু. স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ-দিবসটিকে প্রতিরোধ দিবস- “চৎড়ঃবংঃ উধু” হিসাবে ঘোষনা করেন।

সমগ্র পূর্ব বঙ্গঁ ব্যাপী ঐ দিন সাড়ম্ভরে পাক-প্রজাতন্ত্র দিবসে বাঙ্গাঁলি জাতি প্রতিরোধ দিবস পালন করেন। কেন্টনমেন্ট সমূহ ছাড়া সর্বত্র স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। ঐদিন বিকালে মৌলভীবাজারের ঐতিহাসিক চৌমুহনা চত্বরে আনুষ্টানিকভাবে এক বিশাল ছাত্র-গনজমায়েতের আয়োজন করা হয়। প্রতিরোধ সভায় সভপত্বি করেছিলেন মহকুমা ছাত্রলীগের নব নির্ব্বাচিত সভাপতি দেওয়ান আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী। সদ্য প্রাক্তন সভাপতি এবং ঢাকা থেকে আগত ছাত্রনেতা হিসাবে আমাকে ঐ সভায় প্রধান অতিথি নির্বাচিত করা হয়। সভাটি পরিচালনা করেছিলেন নব নির্ব্বাচিত ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নূরুল ইসলাম মুকিত। স্বাধীনতার সংঘটক এই নির্লোভ মুজিব সৈনিক স্বাধীনতা উত্তর কালে অকালে ইহলোক ত্যাগ করেন। ঐ সভায় আমি সভার সভাপতি সম্পাদক কে নিয়ে তুমুল করতালি এবং মূহুর্মূহ জয়বাংলা শ্লোগানের মাধ্যমে পাকিস্তানের চানতারা খচিত বিশাল পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি পাকিস্তানী জাতির কথিত ও বর্নিত জনক কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি পুড়িয়ে বাঙ্গাঁলি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আপোষহীন নেতা-স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি উত্তোলন করি। এই পুড়ানো-উড়ানোর ছবি উঠিয়েছিলেন চৌমুহনাস্থ তৎকালীন মুক্তা ফটো ষ্টুডিও কর্তৃপক্ষ। মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্য্যায়ে পাকিস্তানী গোয়েন্দাগন ষ্টুডিও থেকে এই ছবি সংগ্রহ করে-গুন্ডা মুজিব ক্যাঁহা হ্যায়- বলে আমার স্যার প্রফেসর বিমল কান্তি ঘোষ সহ অনেককেই ঝুলুম নির্য্যাতন করেছে। ঐ ছবিতে পরে দেখেছি পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত বাবরি চুলে ও আকর্ষনীয় গোঁফে আমাকে দারুন লাগছিল-আমার হাতে পাকিস্তানী পতাকা পুড়ছিল। গর্বে ও আনন্দে আমার বুক ফুলে উঠছিল, মাথা উচু হয়ে উঠছিল। এ নিয়ে আমি এখনও জীবনের পড়ন্ত বেলায় গর্ব বোধ করি, তৃপ্তি পাই।

পাকিস্তান টিকে থাকলে, বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে পাকিস্তানী পতাকা এবং পাকিস্তানী জাতির জনকের ছবি পুড়ানোর রাষ্ট্রদ্রোহীতা মূলক অপরাধে আমার ফাঁসি কিংবা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হত- পি.পি.সি-১২০-বি আইন তাই বলে। পরদিন চব্বিশে মার্চ আমাদের কাছে খবর আসে কমলগঞ্জে পাকিস্তান ও মুসলিম লীগ পন্থীরা স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়াতে এবং প্রতিরোধ দিবস পালন করতে দেয় নি। আমরা পরদিন ২৫শে মার্চ কমলগঞ্জে প্রতিবাদ সভা ও পতাকা উত্তোলনের তারিখ দিয়ে আমরা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কতেক নেতা সহ কমলগঞ্জে যাই। কমলগঞ্জ রেজিষ্টার মাঠে বিশাল ছাত্র-জনসভায় ভাষন দেই, স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি, আমাদের পাকপন্থী প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে আমাদেরকে মোকাবিলার আহ্বান জানাই।

ঐ রাতে মহা আনন্দে মিটিং মিছিল শেষে আমাদের প্রিয় শহর মৌলভীবাজারে ফিরে আসি। জিন্নাহ মিয়ার পাকিস্তান আজিমপুরের গুরস্তান, বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর, সব কথার শেষ কথা বাংলার স্বাধীনতা, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা শ্লোগান দিয়ে চৌমুহনায় আনন্দ মিছিল করি। বলাবাহুল্য এসবই ছিল সেই সময়ের জনপ্রিয় শ্লোগান। আমি খুব উচ্চ স্বরে শ্লোগান দিলাম। লম্বা হওয়ার কারনে মিছিলে আমার মুখ-মাথা থাকত সবার উপরে। একবার শ্লোগান দিতে দিতে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। নাকে-মুখে রক্তপাত হতে থাকে। বালিশে লাল রক্ত দেখে আমি ভয় পেয়ে ছিলাম। সেই সময়কার সিভিল সার্জন এবং আমাদের সমর্থক ও শুভাকাঙ্খী ডা. আব্দুল হাকিম আমাকে খুব ¯েœহ করতেন। তিনি আন্তরিক ভাবে আমার চিকিৎসা করেছিলেন। উজ্জল ফর্সা মুখের সেই চিকিৎসক ভদ্র লোকের প্রতি আমি এখনও কৃতজ্ঞ। তাঁকে স্মরন করি সশ্রব্দ চিত্তে।

পচিশ মার্চের মিছিল মিটিং মিষ্টিমুখ সাধনার বারান্দায় আনন্দ আড্ডা শেষে ঐ রাতে আরো কিছু জরুরী বৈঠকের জন্য আমার সতীর্থ গাজি গোলাম ছরোওয়ার হাদি গাজি সহ আরেক প্রিয় বন্ধু ও সাহিত্য সুহৃদ আজিজুল হক ইকবালের পৈত্রিক বাসগৃহ – হক ভিলায় চলে যাই। গির্জাপাড়াস্থ হক ভিলার টিনের চৌচালা বাংলা ঘর ছিল আমাদের আড্ডা ও অস্থায়ী আবাসস্থল। হক ভিলায় আড্ডা ও বৈঠকে অধিক রাত্র হয়ে যাওয়াতে আমি আমার মুসলিম কোয়ার্টারস্থ পৈত্রিক বাসভবন রসুলপুর হাউসে না গিয়ে হক ভিলায়ই রাত্রি যাপন করি। বন্ধুবর হাদি গাজি তার মামা বিশিষ্ট আইনজীবী আব্দুল মোহিত চৌধুরীর মুসলিম কোয়ার্টারস্থ বিশাল বাসভবনে থাকতেন। তিনিও থেকে গেলেন। আমার এই দুই বন্ধু এবং মোহিত চৌধুরী সাহেব এখন পরলোকে। মহান মালিক তাদের বেহেশত নসিব করুন। বন্দুবর ইকবাল স্বাধীনতা উত্তরকালে কে.এ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং হাদি গাজি একাধিক মেয়াদে নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। স্বাধীনতা উত্তর কালে শ্রদ্ধেও মুহিত চৌধুরী সাহেব সিলেট-বাংলাদেশের মশহুর আইনজীবী হিসাবে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আমি তারই জুনিওর হিসাবে আইন পেশায় যোগ দিয়েছিলাম।

রাখে আল্লাহ মারে কে? ঐদিন আমি বাসায় খান সেনাদের হাতে ধরা পড়তাম। গুলি খেতাম। ২৩শে মার্চের পতাকা পুড়ানোতে খান সেনারা ছাব্বিশে মার্চ ভোরেই আমার বাসগৃহ ঘেরাও আক্রমন করে। আমাকে না পেয়ে আমার বাসায় বসবাস করা রত আমার ফুফুত ভ্রাতা আজিবুর রহমানকে ধরে নিয়ে যায়। আমার বাসার পাশেই হাজি হারিছ উল্ল্যাহ সাহেবদের বাসায় ভাড়া থাকতেন ছাত্রলীগ নেতা এবং সম্ভাবনাময় সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি কলেজ হোস্টেলের বাসিন্দা হলেও রাজনৈতিক কারনে হোস্টেল ছেড়ে আমার বাসার পাশে বাসা ভাড়া করেন। তিনিও পাক সেনাদের বেরিকেড তৈরী করতে গিয়ে গ্রেফতার হন। এই দুইজন মহান আল্লাহর অপার মেহেরবানীতে পাক সেনাদের টর্চার সেল পর্যটন রেষ্ট হাউজ থেকে বাঙ্গাঁলি সৈনিকদের সহায়তায় মুক্তি পান। মতিউর রহমান চৌধুরী বর্ত্তমানে দেশের খ্যাতিমান সাংবাদিক। দৈনিক মানবজমিনের প্রতিষ্টাতা সম্পাদক। আজিবুর রহমান পরে মুক্তযোদ্ধে যোগ দিয়ে খ্যাতি অর্জন করে। বর্ত্তমানে প্রবাসে।

পচিশে মার্চ-একাত্তোর-মানব সভ্যতার আধুনিক ইতিহাসে একটি কলংকময় দিন। ভয়াবহ রজনী। ঐদিন কালরাতে প্রচলিত ও প্রথাগত যুদ্ধের নিয়ম রীতি-নীতি ভঙ্গঁ করে পাক সেনারা নিরস্ত্র বাঙ্গাঁলিদের উপর বিনা ঘোষনায় অতর্কিতে আক্রমন করে। গনহত্যার এই অভিযানের নাম ছিল- অপারেশন সার্চ লাইট-। পাক ফৌজি প্রেসিডেন্ট লেঃ জেনারেল এ.এম ইয়াহিয়া খানের এই বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদ হয় বাংলায়। বাঙ্গাঁলি সেনা অফিসার – জোয়ান- বাঙ্গাঁলি বিডিআর পুলিশ আনছার পাক হানাদার বাহিনীর হত্যা যজ্ঞ অগ্নি সংযোগ-লুটতরাজ-ধর্ষনের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান। পচিশে মার্চের প্রথম প্রহরেই খান সেনারা বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবকে তাঁর ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরের বাড়ী থেকে গ্রেপ্তার করে। এই মহাদূর্যোগ, অনিশ্চয়তা ও ঝংঙ্খার মাঝে চট্টগ্রামস্থ কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক চৌকশ মেজর স্বদেশ প্রেম ও স্বাদেশিকতায় উদ্ভোদ্ধ হয়ে নিজের জীবনকে বাজি রেখে উচ্চ কন্ঠে উচ্চারন করেন-“আই মেজর জিয়া অন বিহাফ অফ আওয়ার গ্রেট লিডার বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডুহেয়ার বাই ডিক্লিয়ার দি ইনডিপেনডেন্স অব বাংলাদেশ-” মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্ত্তীতে মেজর জেনারেল। বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। এই চট্টগ্রামেই একটি ব্যার্থ সেনা অভ্যোত্থানে শহীদ) এর এই ঘোষনা প্রাথমিকভাবে মহান মুক্তিযোদ্ধের একটি দিক নির্দেশনা পাওয়া যায়। বহির্বিশে^ প্রচারিত ও প্রমানিত হতে থাকে পাক হানাদার বাহিনীর এই গনহত্যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন বিষয় নয়- যা পাক কর্তৃপক্ষ বহির্বিশে^- প্রচার করেছিলেন। মেজর জিয়ার এই ঘোষনায় কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিলনা। তিনি যথার্থ ভাবেই সে ঘোষনায় বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবের নাম সংযোজন করেছিলেন- কারন তিনিই ছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি এবং নির্ব্বাচিত নেতা। দ্রুতই সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে অস্থায়ী প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য জেনারেল এম.এ.জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি এবং সমগ্র বাংলাদেশকে এগারো সেক্টারে বিভক্ত করে এগারোজন সেক্টার কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। সমগ্র বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ছিল চার ও পাঁচ নম্বর সেক্টারের অধীনে। সেক্টার দ্বয়ের কমান্ডার ছিলেন যথাক্রমে মেজর সি.আর দত্ত (পরবর্ত্তী পর্য্যায়ে মেজর জেনারেল। রিঃ) এবং মেজর মীর শওকত আলী। (পরে লেঃ জেনারেল। মন্ত্রী। মরহুম)। প্রথাগত পদ্ধতিতে রেজিমেন্ট ও কনভেনশনেল ওয়ার এর পাশাপাশি শত্রুর অর্থনীতি বিদ্ধস্থ এবং মনোবল ভেঙ্গেঁ দেওয়ার জন্য সিরাজুল আলম খাঁন, শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমদ (মাননীয় মন্ত্রী) এবং আব্দুর রাজ্জাক এর নেতৃত্বে গঠিত হয় মুজিব বাহিনী। সমগ্র বাংলাদেশকে চার সেক্টারে ভাগ করে এই চার নেতাকে চার আঞ্চলিক অধিনায়ক এর দায়িত্ব দেয়া হয়। আমাদের সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিনায়ক ছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাবেক নেতা শেখ ফজলুল হক মনি। (স্বাধীনতা উত্তরকালে আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্টাতা চেয়ারম্যান দৈনিক বাংলার বানীর প্রতিষ্টাতা সম্পাদক। পচাত্তোরের পনেরোই আগষ্টে সস্ত্রীক নিহত।)

আমি আমর একাধিক রাজনৈতিক সহকর্মি-নেতাসহ পিছু হটে হটে-ন’মৌজামুক্তাঞ্চলে আশ্রয় নেই। প্রথমতঃ ইয়ূতক্যেম্প এর পলিটিক্যাল মবিলাইজার হিসাবে কাজ করি। মুক্তিযুদ্ধে জনমত সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে জড়িত হই। এ ব্যাপারে আমার ভারতীয় বন্ধু ও সাংবাদিক মোহিত পাল এবং শিক্ষাবিদ রবীন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য্যরে সহমর্মিতা এখনও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি। কুলাউড়ার বিশিষ্ট সাংবাদিক আমার অগ্রজ প্রতিম সুশীল সেনগুপ্ত নাডু দাদার সঙ্গেঁ মুক্তাঞ্চলের অনিয়মিত সাপ্তাহিক পত্রিকা শ্রীভূমি বের করি- যা মুক্তি বাহিনীর কাছে পাঠক প্রিয়তা পায়। অতঃপর ভারতের লোহার বন্দে সামরীক প্রশিক্ষন করি। বৃহত্তর সিলেটের রাজনীতিবিদদের এই ব্যাচ- স্পেশাল ব্যাচ- নামে পরিচিত। ঐ ব্যাচ এর আমি ছিলাম কমান্ডার। কুলাউড়ার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সৈয়দ জামাল উদ্দিন ছিলেন আমার-টু-আই-সি। প্রশিক্ষন শেষে চার নম্বর সেক্টারে সি-ইন-সি স্পেশাল ব্যাচ এর প্রশিক্ষন প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আহাদ চৌধুরীর নেতৃত্বে তাঁর অধিনায়কত্বে সরাসরি রনাঙ্গঁনে কাজ করি। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আহাদ চৌধুরী স্বাধীনতা উত্তরকালে অধ্যক্ষ এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসাবে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিবাভকত্ব করেছেন। এই সেক্টারের আমাদের দুইজন সহযোদ্ধা সৈয়দ মহসীন আলী (পরে সাংসদ। মাননীয় মন্ত্রী। অকাল প্রয়াত।) এবং মির্জা আজিজ আহমদ বেগ আর আমাদের মধ্যে বেঁচে নেই। তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

ভারত-বাংলাদেশ স্বীকৃতি দেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ চুড়ান্ত রুপলাভ করে। খান সেনাদের মনোবল ভেঙ্গেঁ যায়। পিছু হটে তারা ঢাকা-সিলেট কেন্টনমেন্টে আশ্রয় নেয়।

আটই ডিসেম্বর একাত্তোর আমাদের প্রিয় শহর মৌলভীবাজার মুক্ত হয়। মুক্ত মৌলভীবাজারে স্বাধীন বাংলার পতাকা আনুষ্টানিকভাবে উত্তোলন করেন স্থানীয় এম.পি এবং সি,এন,সি স্পেশালের বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান। (একাধিক মেয়াদের সাংসদ। জেলা পরিষদে বর্ত্তমান মাননীয় চেয়ারম্যান।)

১৬ ডিসেম্বর একাত্তোরের পড়ন্ত বিকেলে ঢাকায় ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডার লেঃ জেনারেল জগজিৎ সিং আরোরার কাছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক লেঃ জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী ও তার ছিয়ান্নব্বই হাজার বাহিনীর নিঃশর্ত আত্বসমর্পনের পর আনুষ্টানিক ভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটে। পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের আনুষ্টানিক মৃত্যো হয়। দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার মানচিত্রে গুনগত মৌলিক পরিবর্তন আসে। পাকিস্তান দ্বিখন্ডিত হয়- জন্ম হয় একটি নুতন দেশ-বাংলাদেশ- স্বাধীন বাংলাদেশ। জয় বাংলা ধ্বনিতে  আনন্দ উল্ল্যাসে ফেটে পড়ে সেনা-জনতা। সে অনুভূতি-আবেগে-উচ্ছাস ও আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়-হৃদয় দিয়ে অনুভব করার মত।

একটি আত্বনির্ভরশীল অর্থনীতি, নির্ভেজাল গনতন্ত্র, বৈষম্যহীন সুখী সমাজ-সুশাসন-ই ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল লক্ষ, যা এখনও অধরা স্বপ্নই রয়ে গেছে। মুদ্রাপাচার , দুবৃত্তায়ন ও ভ্রষ্টাচার, বানিজ্যায়নে ও লুন্ঠনে ব্যাংকিং সেক্টারে ধ্বসের দারপ্রান্তে। ডেমোক্রেসী এখন-ইলেক্ট্রক্রেসী-তেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সুশাসনও এখন দুঃস্বপ্ন। এসব দুুঃশাসনের অবসানই স্বাধীনতার সকল শহীদের আত্ব বলিদান সার্থক করতে পারে-নচেৎ নয়।

ষোলই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে স্বাধীনতা সংগ্রামের সকল শহীদানের উজ্জল স্মৃতির প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী ও রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

[একাত্তোরের বীর মুক্তিযোদ্ধা। সিনিয়র এডভোকেট মহামান্য হাইকোর্ট। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সাংবাদিক। কলামিষ্ট]

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”

মন্তব্য করুন