বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) জগতবাসীর জন্য সর্বোত্তম আদর্শ

ডিসেম্বর ১৩, ২০১৬, ৫:৫৬ অপরাহ্ণ
এহসান বিন মুজাহির॥ বিশ্বনবী (সা.) এর শুভাগমন ও ইন্তেকাল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ট ঘটনা। এর চেয়ে অত্যাধিক আনন্দদায়ক, শ্রেষ্টত্ব ও অবিস্মরণিয় কোন ঘটনা বিশ্বের মানচিত্রে দ্বিতীয় ঘটেনি। রবিউল আউয়াল মাসের গুরুত্ব অপরিসীম এতে কোন সন্দেহ নেই। প্রিয় নবীর (সা.) শুভাগমনের কল্যাণে জাহেলিয়্যাত, শিরক, পৌত্তলিকতা ও বর্বরতার ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত দুনিয়ায় হিদায়াতের নূর উদ্বাসিত হয়। জাহিল ও পথভ্রান্ত জাতি হিদায়াতের পরশ পেয়ে জান্নাতের সন্ধান পায়। নবীর আগমনে মানবজাতি দ্বীনের রাস্তার সন্ধান লাভ করে। এমন নবীর আগমনের মাস অবশ্যই অপরিসীম গুরুত্বের দাবি রাখে। বিশ্বনবীর মিলাদ-সিরাত আলোচনা নিঃসন্দেহ গুরুত্বপূর্ণ সওয়াবের কাজ। নবীর জীবনচরিত আলোচনার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ ঈমানের চেতনাকে আরও শাণিত উদ্বেলিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।
উম্মতের হিদায়াতের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেনÑ যাদের কৃতিত্ব কিছু ক্ষেত্রই সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে কৃতিত্ব লাভ করেছেন রাহমাতুল্লিল আলামিন, সরওয়ারে কায়েনাত, ফখরে মওজুদাত, রূহে দু’আলম এবং সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
মহানবী মোহাম্মদের (সা.) জীবনে রয়েছে মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। পুত্র দেখতে পাবে তাঁর মাঝে মাতৃপিতৃভক্ত আদর্শ পুত্রের সর্বোত্তম চরিত্র। পিতা দেখতে পাবে তার মধ্যে মমতাশীল কর্তব্যপরায়ণ আদর্শ পিতার চরিত্র। স্বামী দেখতে পাবে তার মধ্যে স্ত্রী–অনুরাগী আদর্শ স্বামীর চরিত্র। ব্যবসায়ী দেখতে পাবে তার মধ্যে সত্যবাদী আদর্শ ব্যবসায়ীর চরিত্র। যোদ্ধারা দেখতে পাবে তাঁর মধ্যে আদর্শ যোদ্ধার চরিত্র। সেনাপতিরা দেখতে পাবে তার মধ্যে রণকৌশল, স্থির মস্তিষ্ক ও বীর সেনাপতির চরিত্র। জনসেবকেরা দেখতে পাবে তার মধ্যে আদর্শ জনসেবকের চরিত্র। বিচারকেরা দেখতে পাবে তার মধ্যে ন্যায়–নিরপে বিচারকের চরিত্র। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মহামানব বিশ্বনবী মুহাম্মদের (সা.) অনুপম আদর্শ বিদ্যমান।
তিনি যখন এ ধরায় শুভাগমন করেন সেই যুগ ছিল আইয়ামে জাহেলিয়াতের। সে সময়ে গোটা জাতির ওপর অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার, অস্থিরতা, নৈরাজ্য, স্থবিরতা জেঁকে বসেছিল। আরব দেশে বিরাজ করছিল অসংখ্য সঙ্কট ও সমস্যা। যুদ্ধ–সঙ্ঘাত, রক্তপাত ছিল তখন নিত্যদিনের ঘটনা। সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়, মিথ্যা, অসত্য, কুসংস্কার, কুপ্রথা, বিভ্রান্তি, নারী জাতির অবমাননা, শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, ধর্মের নামে অধর্ম প্রভৃতি এমন কোনো দিক ছিল না যেখানে অবক্ষয় ও সঙ্কট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেনি। এমনই এক পরিবেশের মধ্যে শান্তি, মুক্তি ও কল্যাণের পয়গাম নিয়ে তিনি আগমন করেছিলেন। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ সা.) এর মাধ্যমেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার প্রদত্ত দ্বীন ইসলামের পূর্ণতা বিধান করেছেন। বিশ্বনবী সা: তাঁর ২৩ বছরের সাধনায় নির্মাণ করেছিলেন জুলুম, শোষণ ও অবিচারমুক্ত একটি খেলাফতি রাষ্ট্রব্যবস্থা। তার খেলাফতি রাষ্ট্রব্যবস্থা গোটা মানবজাতির জন্য আদর্শ হয়ে আছে। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)এর জীবনাদর্শ গ্রহণ ব্যতিত ইহ ও পরকালে মুক্তি অর্জন সম্ভবপর নয়।
১২ রবিউল আওয়াল মহানবী (সা.) এ ধুলোর ধরায় আগমন করেছিলেন। রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখ নবীজীর জন্ম হয়েছিলো এ নিয়ে ঐতিহাসিকগণ একমত নন। জন্মের তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন ৯ রবিউল আউয়াল, আবার কারো মতে ১২ রবিউল আউয়াল। পক্ষান্তরে ১২ রবিউল আওয়ালে যে নবীর ইন্তেকাল হয়েছিল এ নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। তাঁর মিলাদ (জন্ম) ১২ রবিউল আওয়াল সবার কাছে যেমন ছিল ছিল আনন্দের, তেমনি ওফাতুন্নবী (নবীর ইন্তেকাল) ১২ রবিউল ছিল বিরহ শোকের। নবী নেই তাতে কি? নবীর সিরাত (৬৩ বছরের জীবনী) তো আছেই? নবীর সিরাত সর্ম্পকে আল্লাহপাক কুরআন কারীমে ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে রাসুলুল্লাহর জীবনে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ’। (সূরা-আহযাব:২১)
মূল কথা, নবীর মিলাদ, ওফাত উম্মাহর জন্য কোন মূল বিষয় বিষয় নয়। তাঁর দীর্ঘ ৬৩ বছরের জিন্দেগীই (আদর্শ) উম্মতের জন্য অনুকরণীয়।
আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা রাসূলকে অনুসরণ কর, তবেই তোমরা সত্যপথের সন্ধান পাবে’। (সূরা নূর: ৫৪)
জেনে রাখা দরকার যে, রাসূলের অনুসরণ ব্যতিত ইহ ও পরকালে নাজাত পাওয়া নিতান্তই দুরূহ ব্যাপার। রাসুল্লাহ (সা:) এর অনুসরণের মাঝেই সকল প্রকারের সাফল্য নিহিত।
এসর্ম্পকে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যে কেউ আল্লাহর আনুগত্য করে এবং রাসুলের অনুসরণ করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য লাভ করবে’। (সূরা আহযাব:৭১)
রাসুলের আদর্শ বিচ্যুত হয়ে মুখে নবীপ্রেমের প্রস্বতি গেয়ে মুক্তির আশা করা এবং আশেকে রাসুল দাবি করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অবান্তর। রাসুলকে ভালবাসার নিদর্শন হচ্ছে তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ করা।
এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলে দিন, যদি তোমরা প্রকৃতই আল্লাহর প্রতি ভালবাসা পোষণ কর তবে আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন’। (সূরা ইমরান:৩১)
রাসুলের আদর্শ অনুসরণ না করে মুখে রাসুলপেমিক সাজা প্রতারণা নয় কি?।
নবীজী বলেন, ‘আমার উম্মতের সকল লোকই জান্নাতী হবে অস্বীকারারকীর ব্যতিত।  জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল!  অস্বীকারকারী কে?  উত্তরে রাসূল বললেন ,যে আমার অনুসরণ করবে সে বেহেশতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার নাফরমানী  করবে সে অস্বীকারকারী’। (বুখারি শরীফ)
রাসুল অনুসরণের অর্থ হলো; তাঁর আদর্শ গ্রহণ করা, ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় জীবন থেকে নিয়ে সর্বক্ষেত্রে রাসুলের আদর্শ  মেনে চলা। আল্লাহপাক আমাদেরকে সকল ক্ষেত্রে রাসুলের আদর্শ অনুসরণের তাওফিক দান করুন।

মন্তব্য করুন