মাতৃভাষা ও ইসলাম

ফেব্রুয়ারী ১৪, ২০১৯, ১২:৩৯ অপরাহ্ণ এই সংবাদটি ৯৫ বার পঠিত

শরীফ খালেদ সাইফুল্লাহ॥ পৃথিবীর সকল প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ট হলো মানুষ জাতি, সামাজিক জীব মানুষ তার ছোট্টকাল থেকে কথা বলতে শিখে এবং শৈশবেই প্রত্যেক জাতীর শিশুরা তার মায়ের ভাষায় কথা বলতে শিখে। প্রত্যেক মায়ের ভাষা শুদ্ধ হবে এমন নয় এবং তা হওয়ারও প্রয়োজন নয়। শিশুরা পারিবারিক সভ্যতা শিখার সাথে সাথে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে তাদের ভাষা শুদ্ধ ও প্রাঞ্জল হয়।

যে কোন ভাষায় রস তৈরী করতে হলে প্রয়োজন সাহিত্য চর্চা। মাতৃ ভাষাকে শ্রুতিমধুর করতে, প্রাঞ্জল-শুদ্ধ ও সাবলীলভাবে কথা বলতে হলে সাহিত্য সাধনা অত্যাবশ্যক। কত্তভাষা ও লিখ্য ভাষাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করতে সাহিত্যের সাগরে ডুব দেয়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্পের চিন্তাই করা যায়না। যে জাতি তার ভাষা নিয়ে যত বেশি সাহিত্য গবেষনা ও চর্চা করেছে সে জাতির ভাষা তত বেশি দৃড় ও মসৃণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

নান্দনিক ও উন্নত ভাষা সাহিত্য মানুষের মষ্তিস্ককে করে রঙ্গীন, বিশ্বব্যাপি শেকড় সন্ধানী সাহিত্য গবেষকরা স্ব স্ব মাতৃভাষার সৌন্দর্যকে তাদের সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে জাতির কাছে অলঙ্কৃত করে উপস্হাপন করেছেন। মাতৃ ভাষায় বচন ভঙ্গি, উচ্ছারন নীতি ও জড়তা দূর করতে পড়তে হবে অধিক এবং পড়তে হবে অনুসন্ধানী হয়ে। কথা বলার কলা-কৌশল রপ্ত করতে হবে, প্রয়োজনে বিশেষ বিশেষ বক্তব্য কণ্ঠস্থ করতে হবে, আত্মস্হ করতে হবে উচ্ছাঙ্গের ভাষা নৈপূণ্যতা, আবৃত্তি করতে হবে, ভাষাশৈলীর মূল রহস্য জানতে হবে, অনুসরণ করতে হবে বিশেষজ্ঞদের চমৎকার শব্দভঙ্গি ও উচ্ছারন নীতি। এ সকল নীতিমালার সমষ্টির সম্মিলন ঘটলেই একজন মানুষ ভাষায় পারদর্শী ও শ্রুতিমধুর বক্তব্যের অধিকারী হতে পারেন।

ইসলামে মাতৃ ভাষার গুরুত্বঃ

ইসলাম মানুষের মাতৃ ভাষাকে অত্যান্ত গুরুত্বের সাথে লালন করার অধিকার দিয়েছে। জন্ম সূত্রে যে যে ভাষা নিয়ে পৃথিবীতে আসবে সে ভাষা তার অধিকার, এ ভাষাতেই সে কথা বলবে, মনের ভাব প্রকাশ করবে, লেন-দেন, আদান-প্রদান সবই তার মায়ের ভাষাতে করবে। যে ভাষাতে মানুষের প্রাণ জুড়ায় তা হলো তার মায়ের ভাষ, এ ভাষাকে প্রাণ খোলে ভালোবাসতে ইসলাম উৎসাহিত করে এবং এতে কারো হস্তক্ষেপ ইসলাম কখনো অনুমোদন করেনা। মানুষের অগাদ দুই ভালোবাসার সমষ্টিগত নাম মা ও মায়ের ভাষা এ যেনো মহান রবের এক বড় নেয়ামত।

মহান আল্লাহ বলেন

‘‘অতএব (হে নবী), তুমি নিষ্ঠার সাথে নিজেকে সঠিক দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখো, আল্লাহ্ তা‘আলার প্রকৃতির ওপর (নিজেকে দাঁড় করাও), যার ওপর তিনি মনুষকে পয়দা করেছে; (মনে রেখো) আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে কোনো রদবদল নেই; এ হচ্ছে সহজ জীবনবিধান, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না’’। (আল-কুর’আন, সূরা আর-রূম, আয়াত : ৩০)

পৃথিবিতে মানব জাতির সকল ভাষাকে সিকৃতি দিতে মহান আল্লাহ্ প্রত্যেক নবী-রাসূলকে নিজ নিজ জাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছেন এবং স্বজাতির ভাষায় তাদের উপর আসমানি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন।

যেমন আল্লাহ বলেন

‘‘আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য, আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’ (আল-কুর’আন, সূরা ইবরাহীম, আয়াত ৪)

ইসলাম প্রত্যেক আঞ্চলিক ভাষাকে সম্মান ও সিকৃতি দিয়েছে, যার যার ভাষা ব্যাবহারে স্বাধিনতা নিশ্চিতের লক্ষে সমর্থন দিয়েছে এবং উৎসাহিতও করেছে।

মহাবিশ্বের মহাবিশ্বয় আল-কুরআন মূলত ভাষা ও উচ্চারণ রীতিকে প্রাধান্য দিয়েই অবতীর্ণ হয়েছে। আঞ্চলিকতা তথা মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন ভূ-মন্ডলের মালিক মহান আল্লাহ নিজেই যেমনঃ আল-কুরআন আল কারীম কে আরবের বিভিন্ন পঠনরীতিতে পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ জন্য কুর’আন তেলাওয়াত সাত ক্বির’আতে (৭ প্রকারের পঠনরীতি) প্রচলিত আছে এবং তা জায়েয। বিশ্বনবী সাঃ এক হাদীসে বলেছেনঃ

‘রাসূল সা. বলেছেন : নিশ্চয়ই কুরআন সাত হরফে বা উপভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব, এসকল ভাষার মধ্যে যে ভাষাটি (তোমাদের কাছে) সহজ হয়, সেভাষাতেই তোমরা তা পাঠ কর।’’

(বুখারী, আস-সহীহ, হাদীস নং-৪৭৫৪)

বিশ্বনবী সা. নিজের ভাষা নিয়ে গৌরব করেছেন

তাই ইসলামে মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব করা জায়েয আছে বলেই প্রমানিত হয়। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সা. মায়ের ভাষায় কথা বলতে গর্ববোধ করতেন। তিনি বলতেনঃ ‘‘আরবদের মধ্যে আমার ভাষা সর্বাধিক সুফলিত। তোমাদের চাইতেও আমার ভাষা অধিকতর মার্জিত ও সুফলিত।’’ (ইবনুল আরাবী, আল-মু‘জাম, প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ৩৫৫, হাদীস নং-২৩৪৫)

রহমতে আলম নবী মুহাম্মদ সা.নিজের মাতৃভাষার শুকরিয়া আদায় করতে গিয়ে বলেনঃ ‘‘আরবের সবচেয়ে মার্জিত ভাষার অধিকারী সাদিয়া গোত্রে আমি মানুষ হয়েছি। তাদেরই কোলে আমার মুখ ফুটেছে। তাই আমি সর্বাধিক সুফলিত ভাষা ব্যক্ত করেছি।’’ (ইবনুল মুলাক্কীন, সিরাজুদ্দীন আবূ হাফস উমর ইবনে আলী ইবনে আহমাদ আশ-শাফি‘ঈ আল-মিসরী, আল-বদরুল মুনীর ফী তাখরীযিল আহাদীসি ওয়াল আছারুল ওয়াকি‘আহ ফীশ শারহিল কাবীর, (রিয়াদ : দারুল হিজরাত, ২০০৪ ইং), খ. ৮, পৃ. ২৮১)

উক্ত হাদিসে প্রমানিত হলো মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব করা জায়েয এবং এতে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়াও আদায় হয়।

মাতৃভূমির প্রতি প্রেম ঈমানের অঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়। মহানবী সাঃ বলেছেনঃ

‘‘মাতৃভূমির প্রতি ভালবাসা ঈমানের অঙ্গ।’’(আল-আলবানী, মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন ইবনুল হাজ্জ নূহ, (রিয়াদ : দারুল মা‘রিফাহ, ১৯৯২ ইং),  খ. ১, পৃ. ১১০, হাদীস নং-৩৬)

মাতৃভাষা আল্লাহর কাছে কতই প্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ দেখুন, ভূপৃষ্টে সকল নবী-রাসূল তাদের উম্মতদেরকে নিজের মায়ের ভাষায় ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন এবং ভাষা বিকৃতির কাছ থেকে আল্লাহর নিকট মা’ফ চাইছেন। হযরত মূসা (আ.) স্বীয় ভাষায় উচ্চারণ বিকৃতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে এভাবে দোওয়া করেছিলেনঃ

‘‘আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।’’(আল-কুর’আন, সূরা ত্বাহা, আয়াত : ২৭-২৮)

মাতৃভাষা সয়ং মহান আল্লাহ শিখিয়েছেনঃ

যে ভাবে মহান আল্লাহ কোরআানের সূরা আর রাহমানের ১-৪ নং আয়াতে ঘোষনা দিয়েছেনঃ

‘‘দয়াময় আল্লাহ্। তিনিই শিক্ষা দিয়াছেন কুরআন। তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষ। তিনিই তাহাকে শিখাইয়াছেন ভাব প্রকাশ করিতে।’’

(আল-কুর’আন, সূরা আর্ রহমান, আয়াত : ১-৪)

এ আয়াতে ভাষা শিক্ষার বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ ভাষার মাধ্যমে মানুষ একে অপরের সাথে ভাব বিনিময় করবে, আর সে ভাষাই হবে পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধন। মানুষের ভাষা মহান আল্লাহ্ তা‘আলার একটি বিশেষ নি‘আমত এই আয়াতের ভাষ্যে প্রমান করে ভাষা শিক্ষাও এবাদতের অন্তর্ভূক্ত যদি তা রাসূল সা. এর সুন্নাহ’র মধ্যে থেকে হয়।

আল্লাহ্্ পৃথিবীতে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন মানুষদেরকে হিদায়াতের দিকে পথ দেখানোর জন্য এবং নবী ও রাসূলদের মূল কাজ ছিল দা‘ওয়াত দেয়া। তাই দা‘ওয়াত দানের ক্ষেত্রে ভাষা ও সাহিত্যের গুরুত্ব অপরিসীম যেমন রাসূল সা. এর এক বাণীতে বলেছেন “নিশ্চয় কথার মধ্যে যাদু আছে”। দাওয়াতের কাজে ভাষার উৎকর্ষতা ইসলামের মেসেজ গ্রহনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কোরআন হাদীস প্রচারের জন্য শর্ত প্রথমে নিজের মায়ের ভাষায় তা বুঝা এরপর দেশের জাতীয় ভাষায় চমৎকার রূপে পুরো জাতীকে বুঝানো। এ জন্য ভাষা চর্চা ও মাতৃভাষার সমৃদ্ধির জন্য ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে। সুতরাং ভাষা চর্চা বা বাংলাকে রাষ্ট্রের সর্বত্র সমৃদ্ধ করার লক্ষে ভাষা আন্দোলন করা ইসলামের দৃষ্টিতে খুবই পূণ্যের কাজ বলেই প্রমানিত হয়। কেননা কোন জাতির নিকট দাওয়াত দিতে গেলে আগে ঐ জাতির ভাষা দা’ঈকে(আহ্বান কারীকে) অবশ্যই জানতে হবে এবং তাদের সামনে স্পষ্ট ভাষায় বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে।

এজন্য মূসা আ. আল্লাহ্র নিকট নিজের ভাষা অস্পষ্ট হওয়ার কারণে আপন ভাইয়ের নবুওয়াতী দাবী করেছিলেন আল্লাহর কাছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন :

‘‘আমার ভাই হারুন আমার চেয়ে সুন্দরভাবে ও স্পষ্টভাষায় কথা বলতে পারে, সুতরাং আপনি তাকে আমার সাথে সাহায্যকারী হিসেবে প্রেরণ করুন।

(আল-কুর’আন, সূরা আল-ক্বাসাস, আয়াত : ৩৪)

১৯৫২’র পূর্ব থেকে সংখ্যা গরিষ্ট বাংলাভাষা-বাসিদের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা করার দাবি চলে আসছিলো, সে দাবি না মানার কারনে রক্তদান ও শাহাদাতের মাধ্যমে ১৯৫২ সালে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে যে “ভাষা আন্দোলন” শুরু হয়েছিলো তা এ অঞ্চলের বাংলাভাষিদের ইসলামী আন্দোলনের জন্য একটি জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিলো।

শরিয়তের দৃষ্টিতে ভাষা শহীদদের মূল্যায়ন আমাদের করণীয়

রক্তমাখা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী দিনটি ছিলো ৮ ফাল্গুন সংখ্যা ঘরিষ্ট বাংলাভাষীদের দীর্ঘদিনের দাবি বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে সিকৃতি দেয়ার। কিন্তু না পাকিস্তান সরকার আমাদের সে দাবি না মেনে অযৌক্তিক ভাবে তারা উর্দূকে করেছিলো রাষ্ট্র ভাষা। বাংলার অকুতোভয় দামাল ছেলেরা ৮ ফাল্গুন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী আন্দোলনের ডাক দিয়ে নেমে পড়েন রাজপথে। সালাম, রফিক, জব্বার ও বরকতের মত আরো অনেক যুবকের তাজা রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষা বাংলাকে পেয়েছি আমরা নিজের মতো করে।

নাড়ির সম্পর্ক যে ভাষার সাথে সে ভাষায় আমরা কথা বলতে পারছি, কোরআন হাদীসের বাণি প্রচার করতে পারছি,বিশ্বের দরবারে শির উচুঁ করে স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার প্রতিষ্টিত করেছি, আমাদের মায়ের ভাষায় রাষ্ট্রের কার্য সম্পাদন করছি, আল্লাহ্র প্রশংসা মায়ের ভাষাতেই করছি।

ভাষা শহীদরা নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন মায়ের ভাষা প্রতিষ্টায়, মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় তাঁরা নিজেদের মহামূল্যবান জীবন নির্দিধায় বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাদের এ আত্মদানকে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন যে, তারা শহীদ কি-না?

শরীয়তের ব্যাখ্যা হলোঃ

মহান আল্লাহ্র একক সার্বভৌমত্ব, সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সা. এর রিসালাত ও শেষ বিচারের দিনসহ পরকালীন অন্যান্য যাবতীয় বিষয়ের প্রতি অকুণ্ঠ চিত্তে নিজের আন্তরিক বিশ্বাসের মৌখিক ঘোষণাদান এবং রিসালাতের মাধ্যমে মহানবী সা. এর কাছে প্রেরিত আল্লাহ্ প্রদত্ত মানবজীবনের যাবতীয় বিধান পরিবার-সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে বাস্তবায়নের সংগ্রামে ইসলামী বিরোধী শক্তির হাতে মৃত্যু বরণ করাকেই শহীদ বলে।

যেহেতু মাতৃভাষার সাথে মানুষের আত্মার সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে মাতৃভাষা ব্যবহার করার অধিকার মানুষের সত্ত্বাগত ও স্ববাবজাত ও জন্মগত মৌলিক অধিকার। একটি মৌলিক অধিকার জরুরী অবস্থায় রাষ্ট্র কর্তৃক স্থগিত ঘোষিত হতে পারে; কিন্তু ভাষা এমন ধরনের মৌলিক অধিকার যা কখনো কারো হস্তক্ষেপযোগ্য নয়, এমন কি রাষ্ট্র কতৃক ঘোষিত জরুরী অবস্হাতেও মাতৃভাষা স্হগিত বা কেঁড়ে নেয়ার বিধান নাই। তদুপরি এটি করলে মানবসৃষ্টির কাঠামোতেই হস্তক্ষেপ করার নামান্তর যা কোন শরিয়তেই অনুমোদন করেনা। অতএব এ যদি হয় মাতৃভাষা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তাহলে তা ব্যবহার করার অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নিঃসন্দেহে কোনরূপ বাধা প্রদান করে না বরং মাতৃভাষা আপন করে পাবার সংগ্রামে উপনিত হওয়ার নির্দেশই দিয়ে থাকে। এ জন্যই ইসলামের দৃষ্টিতে সব ভাষাতো বটেই বাংলা ভাষা আন্দোলনকে জালিমের বিরুদ্ধে সংখ্যা গরিষ্ট মজলুমের অধিকার আদায়ের আন্দোলন হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়েছিলো।

নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করতে ইসলাম বিভিন্ন ভাবে মুসলিম জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে।

অধিকার আদায়ের জন্য ইসলামে যুদ্ধের প্রয়োজন হলে যুদ্ধ করে অধিকার আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেনঃ

‘‘যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম।’’(আল-কুরআন, সূরা আল-হাজ্জ্ব, ২২ : ৩৯)।

মজলুমের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জালিমের আঘাতে কেহ ইন্তিকাল করলে আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দেবেন। রোজ কিয়ামতে যার প্রতিদান হবে চিরস্হায়ী জান্নাত।

প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছেঃ

‘‘যায়িদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন তার পিতা থেকে তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করে বলেন : কোন নিপীড়িত অধিকার বঞ্চিত (মুসলিম) নিজের অধিকার তথা হক আদায়ে যুদ্ধ করে নিহত হলে সে শহীদ।’’(আবূ ইয়া‘লা, আহমাদ ইবনে আলী ইবনে মাছনা, আল-মুসনাদ, (দামিস্ক : দারুল মা’মূন লিত তুরাছ, ১৪০৪ হি.), খ. ১২, পৃ. ১৪৬, হাদীস নং-৬৭৭৫)

অপর এক হাদীসের বর্ণনায় এসেছেঃ যে সত্যের পথে, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ও অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করাই সর্বোত্তম জিহাদ।

রাসূল সা. বলেনঃ ‘‘আবূ সা‘ঈদ আল-খুদরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন : অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক তথা সঠিক কথা বলা অর্থাৎ ন্যায় অধিকার প্রদান করার স্পষ্ট দাবী করাই শ্রেষ্ঠ জিহাদ।’’ (আবু দাউদ, সুলায়মান ইবনে আল-আশ আস-সুনান, (বৈরূত : দারুল ফিক্র, তাবি), খ. ৪, পৃ. ২১৭, হাদীস নং-৪৩৪৬; ইমাম ইবনে মাজাহ, আস-সুনান, (বৈরুত : দারুল্ কিতাবিল আরাবী, তা.বি.), খ. ২, পৃ. ১৩২৯; হাদীস নং-৪০১১; তিরমিযী, আবূ ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা, আস-সুনান, (বৈরূত : দারু ইহইয়ায়িত্-তুরাছিল আরাবী, ১৪২১হি.), খ. ৪, পৃ. ৪৭১, হাদীস নং-২১৭৪)

বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা দূর্বার ছিলো যাদের গতি, যারা দূর্জয় কাফেলার সৈনিক সে সকল বীরদের আত্মত্যাগের বিনীময়ে আমরা ১৯৫২তে পেয়েছি বাংলা ভাষাকে। আমরা ঋণী হে ভাষা সৈনিকের শহিদী কাফেলা আপাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ, তাইতো হৃদয় থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সকল শহীদের স্মরনে গাইছে কত প্রশংসামালা। আমরা আপনাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং আল্লাহ্র দরবারে আপনাদের চিরো সুখের আবেদন করছি।

লেখকঃ সম্পাদকঃ মুক্তচিন্তা, প্রিন্সিপালঃ জামিয়া দারুল কোরআন মৌলভীবাজার।

সংবাদটি শেয়ার করতে নিচের “আপনার প্রিয় শেয়ার বাটনটিতে ক্লিক করুন”